মেইন ম্যেনু

পশ্চিমবঙ্গে ৬ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আরো ছ’টি জনগোষ্ঠীকে অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণি (ওবিসি) বলে মান্যতা দিল রাজ্য সরকার৷ মঙ্গলবার রাজ্য মন্ত্রিসভা কালোয়ার, আতা, সরওয়ালা, বাগানি, ভান্ডারি এবং খানসামা- এই ছ’টি জনগোষ্ঠীকে রাজ্যের ওবিসি তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়৷ এই ছ’টিই মুসলিম জনগোষ্ঠী৷ রাজ্যের ওবিসি তালিকায় বর্তমানে ১৬০টি জনগোষ্ঠী রয়েছে৷ তা বেড়ে অচিরেই ১৬৬ হবে৷ এ জন্য রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ দপ্তর বিজ্ঞপ্তি জারি করবে৷

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে শাসকদলের রাজনৈতিক স্বার্থ৷ ওবিসি-র বর্তমান তালিকায় মুসলিমদের ৮৮টি জনগোষ্ঠী রয়েছে৷ তাতে আরও ছ’টি যোগ হওয়ায় রাজ্যের ২৭ শতাংশ মুসলিমের প্রায় ৯৫ শতাংশই ওবিসি সংরক্ষণের আওতায় চলে এলেন৷ মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণমন্ত্রী উপেন বিশ্বাস অবশ্য দাবি করেন, এর ফলে রাজ্যের একশো ভাগ মুসলিমই ওবিসি সংরক্ষণের আওতায় চলে এলেন৷ তার কথায়, ‘মুসলিমদের হাতে গোনা কয়েকটি সম্প্রদায় বাকি রইল৷ ওই সব সম্প্রদায়ের বড়জোর জনা পঞ্চাশ মানুষ হবে৷ রাজ্যে সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় বর্তমানে ১৭ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে৷ স্বভাবতই এই সিদ্ধান্তে সংখ্যালঘুসমাজ খুশি৷’

বর্তমানে রাজ্যের ওবিসি তালিকাভুক্ত জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশই মুসলিম৷ বাকিরা হিন্দু এবং আরো দু’টি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়- শিখ এবং বৌদ্ধরাও রয়েছেন৷ বাম জমানাতেই চাকরিতে সংরক্ষণ চালু হয়েছিল৷ বর্তমান সরকার শিক্ষার সব স্তরে ওবিসিদের জন্য ১৭ শতাংশ আসন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়৷ দু’বছর আগে উচ্চশিক্ষায় তা চালু হয়৷ চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকেও চালু হয়েছে এই সংরক্ষণ৷ শিক্ষার অধিকার আইন চালু হওয়ার পর সব শিশুকেই অবশ্য এলাকার স্কুলে ভর্তি করা বাধ্যতামূলক৷ তার পরেও মমতা ব্যানার্জির ওবিসি সংরক্ষণ চালুকে মুসলিম মন জয়ের চেষ্টা হিসাবেই দেখছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকমহল৷

পশ্চিমবঙ্গের সচিবালয় নবান্ন সূত্রের খবর, পুরভোটের পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই এই ছ’টি জনগোষ্ঠীকে ওবিসি তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মমতা তার সরকারের তরফে সংখ্যালঘুদের আরও কাছে টানার বার্তাই দিতে চেয়েছেন৷ ইমামভাতা চালু করার পর থেকেই যদিও তার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ তুলতে শুরু করেছিল বিরোধীরা৷ তাতে দমে না গিয়ে সংখ্যালঘু মন জয়ে একের পর এক সিদ্ধান্ত নেন তিনি৷ তবু সদ্য অনুষ্ঠিত পুরভোটে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে কিঞ্চিত্‍ ফাটল নজরে এসেছে তৃণমূল নেতৃত্বের৷ এই ভোটে তৃণমূল নজরকাড়া সাফল্য পেলেও এলাকাভিত্তিক পর্যালোচনায় দলীয় নেতৃত্ব দেখতে পাচ্ছেন, মুসলিমদের একাংশ কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকেছে৷ যেমন, কলকাতায় গার্ডেনরিচ, রাজাবাজার, নারকেলডাঙার মতো এলাকায় কংগ্রেস ভালো ফল করেছে যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ অথবা ভোটের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ৷ এই প্রবণতা যাতে গোটা রাজ্যে সংখ্যালঘু সমাজে ছড়িয়ে না পড়ে, সে কথা মাথায় রেখেই মুসলিমদের সিংহভাগকে সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে এলেন মুখ্যমন্ত্রী৷ শুধু পুরভোটের ফলাফলই অবশ্য নয়, দলের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়ের ভবিষ্যতের অঙ্কও তৃণমূল নেতৃত্বকে মাথায় রাখতে হচ্ছে৷ মুকুলবাবু এ পর্যন্ত নিজের দল ও সরকারের কাজকর্ম নিয়ে যেটুকু মুখ খুলেছেন, তাতে সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন বারে বারেই৷ ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকির সঙ্গে মুকুলবাবুর বৈঠক ও ঘনিষ্ঠতা দেখেও তৃণমূল নেতৃত্ব মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত দলের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক দল ছাড়লে সংখ্যালঘুদের কাছে টেনে বেগ দেয়ার চেষ্টা করবেন৷ আগামী মাসের গোড়ায় মুকুলবাবু জেলা সফরে বেরোচ্ছেন৷ তৃণমূল ভবনের আশঙ্কা, মুকুলবাবুর বিরোধিতা অন্য বিরোধী দলগুলিকেও বাড়তি হাতিয়ার জোগাবে৷ তাই মুখ্যমন্ত্রী সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে আরও মজবুত করতে চাইছেন৷

কিন্ত্ত মুসলিমদের খুশি করলে হিন্দু ভোট কাছে টানতে বিজেপির সুবিধা হতে পারে, এই সম্ভাবনাও তৃণমূল নেতৃত্ব মাথায় রেখেছেন৷ অনগ্রসর সম্প্রদায় কল্যাণ দপ্তর জানাচ্ছে, ওবিসি তালিকায় মুসলিমদের ৯৪টি জনগোষ্ঠী বাদে বাকি ৭২টির প্রায় ৯৫ ভাগই হিন্দু, যারা মূলত দলিত, এত দিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অন্তত ভোটের বাক্সে যাদের তেমন গুরুত্ব ছিল না৷ ২০১১-র বিধানসভা ভোটের আগে থেকেই অবশ্য এই পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীও তৃণমূলের সঙ্গেই আছে৷ তাই হিন্দু ভোট হারানোর তেমন আশঙ্কা নেই শাসকশিবিরের৷

ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণ সম্ভব না হওয়ায় রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশন মুসলিমদের পশ্চাদপদ অংশকে ওবিসি তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছিল৷ সেই সুপারিশ মেনে এ রাজ্যে মুসলিমদের ওবিসি ঘোষণা করে ১৭ শতাংশকে সংরক্ষণের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেন অবশ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য৷ মমতা ব্যানার্জি গত চার বছরে সেই তালিকাই দীর্ঘায়িত করেছেন৷






মন্তব্য চালু নেই