মেইন ম্যেনু

পদ্মা সেতু: নির্মাণ যন্ত্রপাতি আসছে রোববার

পদ্মা সেতু নির্মাণের যন্ত্রপাতির প্রথম চালান রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাচ্ছে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু অত্যাধুনিক স্টিল দিয়ে নির্মাণ করার যন্ত্রপাতির নিরাপত্তায় ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর চীনের সাংহাই বন্দর থেকে ড্রেজার, ভাসলন ক্রেন, টাগ বোটসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বোঝাই জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেয়। তবে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় পানির অগভীরতার জন্য পোর্ট জেটি থেকে প্রায় ৪৫ নটিক্যাল মাইল দূরে কুতুবদিয়া মোহনায় নোঙর করা হবে।
নোঙর করা জাহাজের যন্ত্রপাতির নিরাপত্তার জন্য গত ৩০ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ ইবনে কাসেম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি সেতু বিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, নৌ-বাহিনীর সদর দপ্তরের পরিচালক (ন্যাভাল অপারেশন), পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মূল সেতু নির্মাণ কাজে নিয়োজিত ঠিকাদার চীনা মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড মূল সেতু নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে শিপমেন্ট করেছে।
যন্ত্রপাতি বহনকারী জাহাজ গত ২৯ সেপ্টেম্বর চীনের সাংহাই বন্দর থেকে রওনা দিয়েছে, যা আগামীকাল ১২ অক্টোবর রোববার নাগাদ বাংলাদেশে পৌঁছবে।
সেতু বিভাগ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘জাহাজটি কখন আসবে এটা বলতে পারবো না। এটা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বলতে পারবে। তবে এর আগে আরো ৪টি জাহাজ এসেছে। পর্যায়ক্রমে অনেক জাহাজ আসবে।’ জাহাজের যন্ত্রপাতির সার্বিক নিরাপত্তার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে সচিব জানান।
সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চীনা মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে গত ১৭ জুন রাজধানীর রূপসী বাংলা হোটেলে চুক্তিসই হয়। এতে বাংলাদেশের পক্ষে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির চেয়ারম্যান লিও জিমিং চুক্তিপত্রে সই করেন। ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চার বছরের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ।
এক্ষেত্রে পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রস্তাবিত দরের ১০ শতাংশ (১ হাজার ২১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা) পারফরমেন্স গ্যারান্টি দিয়েছে চায়না মেজর ব্রিজ। শুধু মূল সেতুর জন্য চায়না মেজর ব্রিজ ব্যয় ধরেছে ৯ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা। বাকি ২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে ডলারের দামের তারতম্য ও উপকরণের মূল্যের তারতম্যের কারণে।
পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য চায়না মেজর ব্রিজকে মোট চুক্তি মূল্যের ২৫ দশমিক ৬০ শতাংশ বা ৩ হাজার ১০৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা দেশীয় অর্থে ও ৭৪ দশমিক ৪০ শতাংশ বা ৯ হাজার ২৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় (ডলারে) পরিশোধ করতে হবে।
পদ্মা সেতুর স্থায়ীত্ব ধরা হয়েছে ৯৯ বছর। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি সেতুটির নির্মাণ পরবর্তী ওয়ারেন্টি দিয়েছে মাত্র এক বছর। এ সময়ের মধ্যে সেতুতে কোনো সমস্যা হলে তার দায়িত্ব থাকবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ওপর। এরপর সেতুতে কোনো সমস্যা হলে তার দায় দায়িত্ব থাকবে বাংলাদেশ সরকারের। চায়না মেজর ব্রিজের আর কোনো দায়-দায়িত্ব থাকবে না। যদিও বড় সেতুর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ওয়্যারেন্টি পিরিয়ড ২ বছর। কখনো কখনো তা তিন বছরও দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই কোম্পানি ২ বছরের ওয়ারেন্টি দিয়েছিল।
এদিকে পদ্মা সেতু নির্মাণকালীন ৪ বছর বীমা সুবিধা দেবে চায়না মেজর ব্রিজ। তবে নির্মাণ পরবর্তী সময়ের জন্য সেতুটির কোনো বীমা নিরাপত্তা দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি।
পদ্মা সেতুর একটি প্রান্ত থাকবে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায়, অন্যপ্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরায়। এতে সড়কের পাশাপাশি রেল চলাচলের ব্যবস্থাও থাকবে।
সেতুটি বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি হবে। এতে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়বে বলে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২ জুন মূল সেতুর কার্যাদেশ দেয় সরকার। গত বছর ২৬ জুন চূড়ান্ত দরপত্র আহ্বানের পর চারটি প্রাকযোগ্য কোম্পানির তিনটি দরপত্র সংগ্রহ করে। কারিগরি প্রস্তাবও জমা দেয় তিন কোম্পানি। কিন্তু চূড়ান্ত আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়নি দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিএন্ডটি করপোরেশন ও ডেলিম-এলএন্ডটি জেভি। ফলে এককভাবে অংশ নিয়েই পদ্মা সেতুর কাজ পায় চায়না মেজর ব্রিজ।
এর আগে ২০১১ সালে পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ১২৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। তবে তিন বছর বিলম্ব হওয়ায় মূল সেতু নির্মাণে ব্যয় বাড়ছে ৩ হাজার কোটি টাকা। গত ২২ মে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণে চীনা কোম্পানির দরপ্রস্তাব অনুমোদন করে।
সেতু বিভাগের তথ্য মতে, ২০১০ সালের ১১ মে পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণে প্রাথমিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষে ২০১১ সালের মাঝামাঝি ঠিকাদার নিয়োগ দেয়ার কথা ছিল। সে সময় মূল সেতুর ব্যয় প্রাক্কলন (প্রাথমিক ব্যয়) করা হয় ৯ হাজার ১২৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এতে বিশ্বব্যাংকের আপত্তিতে ২০১১ সালের আগস্টে প্রকল্পের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
নানা জটিলতায় প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালের ২৬ জুন চূড়ান্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। আর গত ২৪ এপ্রিল মূল সেতুর আর্থিক প্রস্তাব জমা পড়ে। এতে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা দর প্রস্তাব করে চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি। অর্থাৎ মূল সেতু নির্মাণে ব্যয় বেড়েছে ৩ হাজার ৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। এরই মধ্যে সেতুর উভয় দিকের সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করেছে। জমি অধিগ্রহণও সম্পন্ন হয়েছে।
এছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্পের অপর তিন অংশ জাজিরা সংযোগ সড়ক, মাওয়া সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এলাকা-২ এর নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।






মন্তব্য চালু নেই