মেইন ম্যেনু

নির্বাচনে নিতে কংগ্রেস চাপ দিয়েছিল

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত বৈঠকে কি আলোচনা হয়েছে-তা নিয়ে জনমনে নানা কৌতূহল রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে বেগম খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, কিভাবে কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে পাশ কাটিয়ে জনসমর্থনহীন একটি নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপ দিয়েছিল। ওই বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপার্সন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিংয়েরও কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ সফরে আসলে আমরা সুজাতা সিং-কে জানিয়েছি, কেন বিএনপিসহ ১৯ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। আমরা এটাও বলেছি, বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল; কোনো গোপন সংগঠন নয়। নির্বাচন স্বচ্ছ না হলে তাতে অংশ নেয়ার কোনো কারণ নেই। তবুও উনি চাপ সৃষ্টি করেছিলেন ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনে অংশ নিতে। এপ্রসঙ্গে তিনি তৎকালীন কংগ্রেস সরকারে সমালোচনা করে সুষমার কাছে প্রশ্ন রাখেন, এটি কি কোনা গণতান্ত্রিক দেশের আচরণ? জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপার্সনের এমন প্রশ্নে ভারতের সুষমা স্বরাজ জানান, তার সরকার বিগত সরকারের মত আচরণ করবে না। এসময় বেগম জিয়া তার দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, আমরা অচিরেই শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাব।
উল্লেখ্য, দুই নেত্রীর মধ্যে এই বৈঠকটি ২০ মাস পর অনুষ্ঠিত হলো। এর আগে ২০১২ সালের ২৯ অক্টোবর দিল্লির ১০ সবদার লেন-এ লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা এই সুষমা স্বরাজের সরকারি বাসায় একইভাবে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর ২০ মিনিট একান্তে বৈঠক হয়েছিলো। তখনকার লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতাই এখন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে। এখন সব মহলেই কৌতূহল কি কথা হলো এই দুই নেত্রীর মধ্যে। এবার বৈঠকটি হলো গত ২৭ জুন সোনারগাঁও হোটেলে। এই বৈঠকটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা সমালোচনা রয়েছে। অনেকেই বলছেন প্রটোকল ভেঙে বেগম খালেদা জিয়ার এমন বৈঠকে বসা ঠিক হয়নি। তবে বিএনপি এ নিয়ে বেশ খুশি।
বিএনপির নীতি নির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা ইনকিলাবকে জানায়, বিএনপির সঙ্গে বিজেপির একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আর আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সদ্য বিদায়ী কংগ্রেসের। বিএনপি যখন সরকার গঠন করেছিলো তখন ভারতের লোকসভায় ছিলো বিজেপি। ভারতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর প্রতিবেশী হলেও বিএনপির প্রতি তাদের বৈরী আচরণে ছিল। বিরোধী দলে থাকার পর কংগ্রেস সরকার আরো রুষ্ট হয় বিএনপির প্রতি। যে কারণে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে যেভাবে সমর্থন দিয়েছে তা অন্যদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ইনকিলাবকে বলেন, আমরা অতীতে লক্ষ করেছি ভারতে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সাউথ ব্লক বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতে যে নীতিমালা তৈরী করা হয়েছিলো তা দুটি দেশের দুইটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে, দুই দেশের জনগণের মধ্যে নয়। ভারতের মতো একটি দেশের অভিজ্ঞ ও ঝানু কূটনীতিকদের দ্বারা সৃষ্ট এ ধরনের নীতি ছিলো একটি মারাত্মক ভুল। যার ফলেই দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়।
তিনি বলেন, ১৯৭১’এর পর এবারই প্রথম ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, তারা চায় দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক, দুইট দলের মধ্যে নয়। এখন প্রশ্ন হলো তারা এখন যে পরিবর্তনটি আনতে চাইছেন তাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সাউথ ব্লকের কূটনৈতিক আমলা তন্ত্রের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিবেশীর প্রতি বৈদেশিক সম্পর্ক কতোটা নিশ্চিত করতে পারবেন।
সাবেক এই মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী একজন বাস্তবধর্মী রাজনীতিবিদ। তার সরকারের প্রথম মাসের কর্মকা-েই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বিন্যাস করতে হবে এবং এ কাজটি তিনি ইতোমধ্যে শুরু করেছেন।
ড. মঈন খান বলেন, আমাদের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সরকার দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলছেন, বিএনপি সরকারে নেই, সংসদেও নেই। কিন্তু তারপরও বিএনপি চেয়ারপারসনের সাথে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বৈঠক করার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদি। এতেই প্রমাণিত আজকের ভারত সরকার অভিহিত যে, বাংলাদেশের জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব কারা করেন।
খালেদা-সুষমার কথোপকথন : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বিজেপির প্রবীণ নেতা সুষমা স্বরাজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। দুই নেত্রীর মধ্যে সাক্ষাত রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে আটকাতে পারেনি। ১০টা ২৫ মিনিটে নগরীর সোনারগাঁও হোটেলে অষ্টম তলায় ‘বেঙ্গলী’ প্রেসিডেন্ট সুট্যে যান খালেদা জিয়া। সেখানেই বৈঠক হয় দুই জনের। আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগে তার দেশের প্রতিনিধি দলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন সুষমা স্বরাজ। আলোচনা হয় ১৬ মিনিট। এ সময় উভয় পক্ষের প্রতিনিধি দলের সদসদের উপস্থিতি ছিলেন। পরে তাদের অনুগ্রহপূর্বক বাইরে অপেক্ষা করার কথা বলা হয়। তখন উপস্থিত বিএনপি ও ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ওই রুম ত্যাগ করেন। এরই মধ্যে দরজা বন্ধ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও সুষমা স্বরাজের সঙ্গে একান্তে ১২ মিনিট রুদ্ধদার বৈঠক চলে। তারা দুই জনেই বেশিরভাগ সময় হিন্দি ও মাঝে মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলছিলেন।
দীর্ঘ দিনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই বিজেপি নেত্রী সুসমা স্বরাজ বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন।
খালেদা জিয়াও সুষমার ব্যক্তিগত কুশলাদি ও উভয়ের পারিবারিক খোঁজখবর নেন। পারিবারিক আলাপচারিতার ফাঁকে উঠে আসে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা।
খালেদা জিয়া বলেন, সোনিয়ার কংগ্রেস সরকারের বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিশেষ করে নির্বাচনের বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে। ওই সরকার আওয়ামী লীগ সরকারকে একতরফা নির্বাচনের জন্য অন্ধভাবে সমর্থন করেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়েছে। ৫ জানুয়ারি কোনো নির্বাচনই হয়নি। জনগণ কেন্দ্র বর্জন করেছে। মাত্র ৪/৫ পার্সেন্ট ভোট পড়েছে তার মধ্যে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারীরাই সীল মেরে বাক্সে ভরে দিয়েছে। বিদেশে এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নেই।
গত নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ সফরে আসা ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং-এর কড়া সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা কেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারছিলাম না তা আমরা সুজাতাকে বলেছিলাম। আমরা একটি রাজনৈতিক দল, কোনো গোপন সংগঠন নই। নির্বাচন স্বচ্ছ না হলে তাতে অংশ নেয়ার কোনো কারণ নেই। তবুও সে চাপ সৃষ্টি করেছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে। এটি কি কোনা গণতান্ত্রিক দেশের আচরণ?
ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত বন্ধুর মতোই আচরণ করবে-এমন কথা উল্লেখ করে বেগম জিয়া বলেন, বিএনপি ও এ দেশের জনগণ মনে করে প্রতিবেশী দেশের নতুন সরকার নতুন করে এগিয়ে আসবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন হবে, জনগণই তাদের অধিকার আদায় করে নিবে। তারা প্রতিবেশীর কাছ থেকে বাধা নয়, সহযোগিতা চায়।
জবাবে সুসমা স্বরাজ বলেছেন, বিজেপি সরকার ইন্ডিয়ার গত সরকারের ধারাবাহিকতা নয়।
এ সময় খালেদা জিয়াও বলেন, ৫০ বছরের ইতিহাস গড়েছে বিজেপি। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। ভারত জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেয়। আমাদের দেশের জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে।
খালেদা জিয়ার এমন কথার প্রেক্ষিতে সুসমা স্বরাজ বলেছেন, নরেন্দ্র মোদির সরকার ইন্ডিয়াকে শীর্ষ উন্নত দেশে পরিণত করতে সার্কভুক্ত দেশগুলো বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সুতরাং আমরাও সুসম্পর্ক চাই। জনগণ তাদের অধিকার আদায়ের করণীয় ঠিক করবে। এ দেশের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করবে না ইন্ডিয়া সরকার।
একই সাথে ২০১২ সালের অক্টোবরে দিল্লি সফরে ‘বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের সন্ত্রাসীদের ঠাঁই হবে না’-খালেদা জিয়ার এমন অঙ্গিকার একান্তে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আবার উল্লেখ করেন তিনি। তিস্তা, সীমান্তে উত্তেজনা, টিপাইসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলাপ হয় দুই নেত্রীর মধ্যে।
এর আগেই হাইকমিশনের মাধ্যমে ৫টি শাড়ি উপহার দিয়েছেন খালেদা জিয়া। দিল্লি সফরকালে তৎকালের লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা সুসমা সরাজের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাতকালে খালেদা জিয়াকে ফল দিয়ে আপ্যায়ন করছিলেন সুষমার কন্যা। এ সময় সুষমা বলেছিলেন, বাংলাদেশের ইলিশ ও জামদানি শাড়ি তার খুবই পছন্দের।
দিল্লি সফরকালে সবদার লেনের নিজ বাসার কাছে গেলেই সুষমা স্বরাজ খালেদা জিয়ার হাত ধরে নামিয়েছেন গাড়ি থেকে। জড়িয়ে ধরেছিলেন একান্ত স্বজন হিসেবে। বলেছিলেন, বিজেপি সরকার গঠন করলে বিএনপি আর বাংলাদেশে বিএনপি এক হয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান সমস্যার সমাধান করা হবে। ভুয়সী প্রসংসাও করেছিলেন বাংলাদেশ ও তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরিকল্পনার।
সোনারগাঁও হোটেলের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর খালেদা জিয়ার সাথে বেঙ্গলী’ সুট্য পর্যন্ত আসেন সুষমা। বিদায় নেন বিএনপির প্রতিনিধি দলের কাছ থেকেও।
ধারাবাহিকভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন, সরকারের বিরোধী দলীয় নেতাসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেন সুষমা স্বরাজ। মন্দির পরিদর্শন ও একটি সেমিনারেও অংশ নেন তিনি।
দেশে ফেরার পথে বিমানবন্দরে বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ভারত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন বলেন, আমরা এমন একটি উপলব্ধি নিয়ে দেশে ফিরে যাচ্ছি যে, বাংলাদেশ সরকার ও সমাজের মধ্যে বিস্তৃৃত পরিসরে ভারতের সঙ্গে আরো বৃহত্তর পরিসরে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও আন্তঃসম্পর্কের আকাক্সক্ষা ও অনুভূতি বিরাজ করছে। এসময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাংলাদেশে সরকার ও জনগণের উষ্ণ আপ্যায়ন ও আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।






মন্তব্য চালু নেই