মেইন ম্যেনু

ডিবির জালে ৪ জিনের বাদশা

বরিশাল মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ গাইবান্ধার গবিন্দপুর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে কথিত ৪ জিনের বাদশাকে আটক করেছে।

সোমবার বরিশাল মেট্রোপলিটন ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে আটকদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং করে বিষয়টি পুলিশ প্রশাসন মিডিয়া কর্মীদের জানান দেয়। গত বৃহস্পতিবার থেকে রোববার রাত পর্যন্ত ওই উপজেলার রামনাথপুর এলাকায় এ সফল অভিযান চালানো হয়।

আটক জিনের বাদশারা হলেন-ওই এলাকার দুলু মিয়া (২৮), মোজাম্মেল হক ইঞ্জিল (৫২), এনামুল হক (৩২) এবং ছানা চন্দ্র মহন্ত (৩৫)।
আটকদের ভাষ্যমতে, তারা ওই এলাকায় বসে মোবাইল ফোনে দেশের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষকে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৌশলে বশ করার চেষ্টা করেন। অমনি করে বরিশাল নগরীর সাগরদী এলাকার জোসনা বেগম নামে এক নারীকে বশ করে স্বর্ণালঙ্কারসহ মোটা অর্থ হাতিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে ওই নারী প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পেরে বিষয়টি বরিশাল ডিবি পুলিশকে জানান। সে অনুযায়ী একটি বিকাশ নাম্বারের সূত্র ধরে অভিযান চালিয়ে গাইবান্ধা জেলার গবিন্দপুর উপজেলা থেকে তাদের আটক করতে সফল হয় ডিবি পুলিশ।

বরিশাল ডিবি পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. আজাদ রহমান বাংলামেইলকে জানান, ওই নারীর মোবাইল ফোনে ২৯ অক্টোবর রাতে প্রতারক চক্রের সদস্যরা কল দিয়ে নিজেকে জিনের বাদশা পরিচয় দেয়। এ সময় তিনি মদিনা শরীফে অবস্থান করছে জানিয়ে ওই নারীকে বলে আল্লাহ তোকে একটি স্বর্ণের হাড়ি দিয়েছে। এতে প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে। কিন্তু এগুলো পেতে হলে বেশ কিছু টাকা সদগা দিতে হবে। জোসনা বেগম এরকমের প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে তার প্রস্তাবে সহজে রাজি হয়ে যায়।

কথা অনুযায়ী কথিত জিনের বাদশার দেয়া একটি বিকাশ মোবাইল নাম্বারে পর্যায়ক্রমে ৩৬ হাজার ১৫১ টাকা পাঠিয়ে দেয়।

এ সময় টাকা পয়সা দেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য কথিত জিনের বাদশা জোসনা বেগমকে নিষেধ করেন। কারণ হিসেবে বলা হয় এগুলো প্রকাশ করলে জোসনা বেগমের বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই বিষয়টি অতি গোপন রাখেন জোসনা বেগম।

এরপরে ১ নভেম্বর হঠাৎ করে কথিত জিনের বাদশা দুলু মিয়া ফের জোসনা বেগমের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে অনেকটা জিনের কণ্ঠে বলেন, ‘আল্লাহ তোর ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। তুই প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার পেয়েছিস। তবে সেগুলো পেতে হলে তোকে বেশ কিছু শর্ত মানবে হবে।’

শর্ত অনুযায়ী জোসনা বেগমের বাসার সব স্বর্ণালঙ্কার রুমালে বেঁধে হাড়ির মধ্যে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে বলা হয়। সে অনুযায়ী জোসনা বেগম স্বর্ণালঙ্কারগুলো একটি হাড়ির মধ্যে পানিয়ে ভিজিয়ে রাখে।

পরদিন ২ অক্টোবর প্রতারক দুলু মিয়া হঠাৎ করে জোসনা বেগমের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বরিশাল নগরীর গির্জা মহল্লাস্থ লেচুশাহ মাজারে অবস্থানের কথা জানায়।

এ সময় প্রতারক দুলু মিয়া তাকে বলে পানিতে ভিজিয়ে রাখা স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে মাজারের কাছে এসে তাকে নাম ধরে ডাকতে। কারণ হিসেবে বলা হয় আল্লাহ তোকে যে স্বর্ণের হাড়ি দিয়েছে সেটির সঙ্গে তোর স্বর্ণালঙ্কারগুলো স্পর্শ করাতে হবে। সরল মনে দুলু মিয়ার কথা অনুযায়ী স্বর্ণালঙ্কারগুলো নিয়ে মাজারের সামনে এসে ডাক দেয় জোসনা বেগম।

দরবেশধারী দুলু মিয়া তার ডাকে সারা দিয়ে এসে স্বর্ণালঙ্কারগুলো হাড়িতে স্পর্শ করার কথা বলে নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে কিছুক্ষণ পরে ফের ফোন দিয়ে দুলু মিয়া জোসনা বেগমকে বলেন, ‘অনেক কাজ রয়েছে তাই দ্রুত মদিনা শরীফে চলে এসেছি, তোর সঙ্গে পরে কথা বলবো।’

এরপরে ৪ নভেম্বর সকালে দুলু মিয়া ফোন দিয়ে জোসনা বেগমকে বলেন, ‘তোর জানের সদগা হিসেবে একটি উটের জন্য ১ লাখ টাকা দিতে হবে। এতে জোসনা বেগম অপারগতা জানালে একটি গরু দেয়ার কথা বলে। তা দিতেও অক্ষমতা জানালে একটি ছাগল চায়। তাতে জোসনা বেগম রাজি হলে ১০ হাজার ১৫১ টাকা পাঠিয়ে দিতে একটি বিকাশ নাম্বার দেয়া হয়।

এক পর্যায়ে সর্বশান্ত জোসনা বেগমের হুশ ফেরে, তিনি প্রতারণার শিকার। দিশেহারা এই নারী বরিশাল গোয়েন্দা পুলিশের দারস্থ হন।

অতপর গোয়েন্দা পুলিশ অদৃশ্য সেই জিনের বাদশাকে খুঁজতে মাঠে নামে। বিকাশে টাকা পাঠানো সেই নাম্বারটি জিনের বাদশাদের অবস্থায় সনাক্তে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এরপর মোবাইল ট্রাকিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় এই প্রতারক চক্রের বাড়ি। বরিশাল ডিবি পুলিশের ৫ সদস্যের একটি টিম এসআই আহসান কবিরের নেতৃত্বে সেখানে পৌঁছলে তারাও ভিমরি খেয়ে যায়। কারণ প্রতারকরা যে গ্রামের বাসিন্দা সেই স্থানটি রামনাথপুর জিনের গ্রাম নামে পরিচিত। ডিবি পুলিশ গোবিন্দগঞ্জ পুলিশের সহয়তায় সেই রামনাথপুর পল্লীতে অভিযান চালায়। এসময় কয়েকবার তারা প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। অবশেষে রোববার রাতে দুলু মিয়াসহ এই চক্রের ৪ সদস্যকে আটক করে বরিশালে নিয়ে আসে।

এ সময় আটক ৪ কথিত জিনের বাদশা স্বীকার করেন, তাদের এই প্রতারণা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও সয়াহক ভূমিকা রাখেন। সেখানকার ইউপি চেয়ারম্যানসহ, উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাংসদ সদস্য তাদের আশ্রয়দাতা। যে কারণে স্থানীয় প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে না। তাছাড়া ওই গ্রামের বাসিন্দারা সবাই সংঘবদ্ধ হওয়ায় কেই অভিযান চালাতে সাহস পায় না।

আটক এই প্রতারক চক্রের ৪ সদস্যের বিরুদ্ধে জোসনা বেগম বাদী হয়ে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই