মেইন ম্যেনু

রম্যরচনা

জনৈক তরুনী, বিড়ম্বনা এবং অতঃপর

গত কয়েকদিন আগে আমার সাথে একটি বেশ আচানক ঘটনা ঘটেছিল। ইতিপূর্বে এই ধরনের কোন অভিজ্ঞতা আমার হয় নি কিংবা অন্য কারো সাথেও হয়েছে বলে আমার জানা নেই। ভেবেছিলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই ঘটনাটি শেয়ার করে কিছু অশেষ লাইক ও রগরগে কমেন্ট কামিয়ে নিব। কিন্তু পাঠকদের কাছে ঘটনা প্রবাহের সঠিক দৃশ্যায়নের জন্য যে বিস্তৃত বর্ননার প্রয়োজন তা ব্লগ ছাড়া অন্য কোথাও নেই বলে এখানেই প্রকাশ করলাম। যারা ভালো লেখা পড়তে চান, তারা অনুগ্রহ করে এখান থেকেই বিদায় নিন। কেননা ব্লগের এই ব্যক্তিগত অংশটিতে কেবলই ছাইপাশ আর স্বস্তা লেখার ছড়াছড়ি। যাই হোক এখন মূল ঘটনায় আসি-

ব্যক্তিগত একটি কাজে কিছুদিন আগে আমি মিরপুর পল্লবীর দিকে গিয়েছিলাম। আসার সময় সেফটি পরিবহনের একটি বাসে উঠে পড়লাম। তখন রাতের প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। শীতের তীব্রতার কারনে রাস্তায় মানুষজন বেশ কম, ফলে বাসটি বেশ ফাঁকাই ছিল। আমি বাসের মাঝামাঝি থেকে একটু সামনের দিকে ডানপাশের একটা জানালার পাশের সিটে বসেছিলাম। আশেপাশের সিটগুলো ফাঁকাই ছিল। দশ নাম্বার গোল চক্কর আসার পরপরই করে বাস মোটামুটি ভর্তি হয়ে গেল। ততক্ষন পর্যন্ত আমার পাশের সিটটা খালিই ছিল। হঠাৎ হুড়মুড় করে বাসে একটা মেয়ে উঠে আসল। তারপর এদিক সেদিক কিছুক্ষন তাকিয়ে তিনি ধুম করে আমার পাশে এসে বসলেন। বাসের সিটে কোন মেয়ে পাশাপাশি বসলে তাকে তো আর ঘাড় ফিরিয়ে দেখা যায় না, এই ক্ষেত্রে ‘বাঁকা চোখই’ ভরসা। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমিও এই প্রক্রিয়ার ব্যতিক্রম ছিলাম না।

তো যাত্রী তোলা শেষ করে কিছুক্ষনের মধ্যেই বাসটি প্রবল বেগে চলতে শুরু করল। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। কানে হেডফোনে যদিও বাজছে রোনান কিটিং এর একটি অসম্ভব রোমান্টিক গান “ইফ টুমোরো নেভার কামস”, তথাপি আমি মুখে বিড় বিড় করছি, ‘আচমকিতে লুকিং গ্লাসে পইড়া চোখে চোখ, দুষ্টামিতে চোখ মাইরাছে, বাঁকা কইরা ঠোঁট, ও আমার রসের ড্রাইভার, আমি তোমার প্যাসিঞ্জার, মন্থর কইরা চালাও তোমার গাড়িরে….’ হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার শরীরের বাম পাশে বেশ চাপ লাগছে! অর্থাৎ যে পাশে মেয়েটি বসেছে সেই পাশ থেকে একটা একটা মৃদুমন্দ চাপ অনুভব করছি। কপাল কুঁচকে মনে মনে ভাবলাম, সে কি রে!! পাশে তো একটা মেয়েই বসেছিল নাকি!!

বাইরের দিকে তাকিয়েই চোখ বন্ধ করে স্মৃতি হাতড়িয়ে আবারও নিশ্চিত হলাম, হ্যাঁ পাশে তো একটা মেয়েই তো বসেছে! তাহলে আবার এই ধরনের আকস্মিক চাপাচাপি কেনু?? চিন্তিত মনে ভাবছিলাম, শালার এই মেয়ের কান তো সেই খাড়া। আমার বিড়বিড় করা কথাগুলো শুনে ফেলল আর নিজের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে অন্যের উপর এইভাবে চাপাচাপি! তীব্র অনিশ্চয়তা এবং বাস্তবতার দন্দে শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি হলো, নাহ! দেশটা আসলে পুরাই রসাতলে গেসে। এইভাবে প্রকাশ্যে এডাম টিজিং!!?? কলিকাল, ঘোরতর কলিকাল!

ইচ্ছে হলো মাথা ঘুরিয়ে মেয়েটাকে একটা কড়া ধমক দিয়ে বলি, কি হচ্ছে টা কি? ঘরে কি আপনার বাপ ভাই নেই? পরে আবার ভাবলাম, ছ্যা! ডায়লগটি অতি নাটকীয় হয়ে যাবে। থিংক পজেটিভ। বি পজেটিভ। ইভটিজিং যদি সুন্দরী তরুনীদের সাথেই হয়ে থাকে তাহলে এডাম টিজিং নিশ্চয় আকর্ষনীয় তরুনদের সাথেই হবে। তাছাড়া মিথ্যে মেকি রুপের এই বাজারে নিজের সৌন্দর্যের বাজারদর উপলব্ধি করার সুযোগই আর পাই কোথায়? তার চেয়ে কিছুক্ষন চুপ থাকি এডাম টিজিং উপভোগ করে সব নারীদের না পারি অন্তত জনৈক তরুনীর সমঅধিকার নিশ্চিত করি।

ফলে আমি বাইরে তাকিয়েই আছি, বাস প্রবল গতিতে ছুটে চলেছে, গতির সাথে তাল মিলিয়ে আমার বাম দিকে চাপ বাড়ে আর কমে। এই ক্রমাগত চাপাচাপিতে বিরক্ত হয়ে মনে মনে ভাবছি, আজকে বাসায় ফিরেই নারী সমাজের এত অধঃপতন ও অবক্ষয় নিয়ে একটি জ্বালাময়ী পোষ্ট দিব। হঠাৎ মনে হলো- সর্বনাস! এই মেয়ে আবার পকেটমার শ্রেনীও কেউ নয় তো? ইদানিং তো প্রায় মহিলা পকেটমারের কথা শুনতে পাওয়া যায়। যারা নাকি পুরুষসুলভ ‘হাতিয়ে’ নেয়ার চাইতে আক্ষরিক অর্থে ‘হাতিয়ে’ নেয়ায় বেশি পারদর্শি?

তওবা তওবা বলে তাড়াতাড়ি করে মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম! আর তাকানো মাত্রই আমার হার্টফেল করার দশা হলো। চেয়ে দেখলাম, আমার পাশের মেয়েটি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এমনকি উনার মুখটা পর্যন্ত হা হয়ে আছে। বাসের ক্রমাগত দুলুনিতে তিনি আমার কাধের দিকে ভর করে চেপে চেপে দুলছেন! আকস্মিক এই ‘চাপাচাপির’ রহস্য উম্মোচনে আমি আনন্দিত হব না দুঃখিত হব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না তবে নারীর সমঅধিকার প্রদান করার বিষয়ে আমার অবদানের সুখস্মৃতি ততক্ষনে বালির বাঁধের চুরচুর হয়ে গেছে।

এতক্ষনে বাসে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য যাত্রীদের দিকে চোখ পড়ল। তারা সবাই এই আচানক ঘটনা দৃশ্য বেশ প্রান ভরে উপভোগ করছেন। লোকাল বাসে একটি মেয়ের এইভাবে হা হয়ে ঘুমানোর দৃশ্য শেষ কে কবে কোথায় দেখেছে আমার তা জানা নেই। ফলে তাদের বড় বড় চোখে মিটিমিটি মুখের হাসির এই যৌথ প্রয়াস আমার কাছে গা জ্বালানোই বলে প্রতীয়মান হল। আর বাসের হেলপার সে তো এককাঠি সরেস। কাছে এসে মুচকি হাসি দিয়ে বলল, মামা ভাড়া দেন, দুইজনের ৪০ টাকা।

আমার আর সহ্য হলো না। প্রবল ঝাড়ি দিয়া বললাম, ঐ বেটা ঐ! দুই জনের ভাড়া আইল কইথিকা? দেখস না বেটা বিনা পয়সায় কাঁধ ভাড়া দিসি। আমার ভাড়া মাফ! ভাড়া যা দেবার এই আফা দিব। ঘুমের মইধ্যে নো ডিস্টার্ব। ঘুমের মধ্যে কিছু করন ভালা না।

হেলপার আমার কথায় মনে হয় কিছুটা থতমত খেলো। আর এই সব কথাবার্তায় মেয়েটির ঘুম ভেংগে গেল। ঘুম ভেঙ্গে নিজেকে পর পুরুষের বাহুলগ্নে আবিষ্কার করে সাথে সাথে তিনি কিছুটা দূরে সরে গেলেন। হেলপার আমার দিকে এবার কিছুটা ভয়ে ভয়ে তাকাল। যেন বলতে চাইছে, স্যরি মামা, এইভাবে সরইয়া যাইব তা তো বুঝি নাই। মেয়েটি হেলপারকে আধো ঘুম ঘুম কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, মাম্মা! শ্যাওড়াপাড়া আসছে? আমি শ্যাওড়াপাড়া নামব।

মানুষ কথা শুনে, আর আমি গন্ধ পেলাম! কিন্তু যে জিনিসের আমি গন্ধ পেলাম তাতে আমি পুরাই বিস্মিত ও হতবাক। মেয়েটির মুখ থেকে মদের গন্ধ আসছে। একেবারে তাজা মদের গন্ধ! এতক্ষন ধরে এই গন্ধটাই অল্প অল্প করে পাচ্ছিলাম। কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না বা মিলাতে পারছিলাম না যে কোথা থেকে এই গন্ধ আসছে। আমি আরো ভাবলাম, শীতের রাত্রীতে বুঝি সবই আমার উষ্ণ মনের লোলুপ কল্পনা। কিন্তু হেলপারের কথায় যা সন্দেহ ছিল তা পুরোটাই দুর হয়ে গেল। হেলপার বিরক্ত স্বরে বলল, শ্যাওড়াপাড়া আসছে মানে? তালতলা পার হইয়া গেলাম গা, আর আপনে কইতাছেন শ্যাওড়া পাড়ায় নামবেন। অবশ্য মাল খাইয়া গাড়িতে উঠলে টের পাইবেন কেমনে কই আছেন?

এবারে বাসের দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় সকল মানুষ আমাদের দিকে ঘুরে তাকাল। মেয়েটি এবার সিটে মাথা হেলান দিয়ে ওড়না দিয়ে কিছুটা মুখ ঢেকে হেলপারকে উদ্দেশ্য করে ইংরেজি ‘এফ’ অদ্যাক্ষরের একটি শব্দ উচ্চারন করে কিড়মিড় করে বলল তাকে নামিয়ে দিতে। মানুষের তিরস্কারমূলক চাপা গুনগুন শব্দ বেড়ে যাওয়াতে হেলপার মহা বিরক্ত হয়ে ড্রাইভারকে হাঁক দিল, ওস্তাদ ব্রেক মারেন! কাটপিস নামব! আমি হেলপারে রসবোধে মুগ্ধ হলাম।

ড্রাইভার ব্রেক কষলেন। জানালা দিয়ে উৎসুক মানুষের চাহুনী, টিপ্পনী আর কটু কথার মাঝ দিয়ে মেয়েটি ভীড় ঠেলে আইডিবি ভবনের সামনে নেমে গেল। বাস আবার চলতে শুরু করল। কাহিনীও প্রায় শেষ হবার পথে। কিন্তু শালার পাবলিকের রস আর কমে না। এখনও অনেকেই আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছেন। আমি আবারো বাঁকা চোখেই ব্যাপারটি পর্যবেক্ষন করছি। ইতিমধ্যে কয়েকজন বিজ্ঞ সমাজ বিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের আবির্ভাব হলো, গনমানুষের সমালোচনায় যেখানে বড় বড় রাজনৈতিক নেতারাও হালে পানি পায় না, সেখানে হয়ত এই বখে যাওয়া, মাদকাসক্ত মেয়েটি তাদের সমালোচনায় যে বিন্দুমাত্র ভদ্র সহানুভূতি পায়নি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কেউ মদ খাবে কি খাবে না এটা তার নিজস্ব ব্যক্তিগত বিবেচনা এবং ধর্মীয় অনুশাসন বা দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। তবে শুধুমাত্র শিক্ষিত হলেই কেউ আধুনিক মানুষ হয়ে যান না। কেউ আধুনিক মানুষ কিনা সেটা নির্ভর করে মূলত তিনি যে সমাজে আছেন সেই সমাজের রীতিনীতি ও সংস্কৃতিকে মাথায় রেখে শিক্ষাকে ব্যবহার করে তিনি কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ন স্বাধীন জীবন ভোগ করছেন তার উপর। সেইক্ষেত্রে এই মেয়েটি হয়ত আধুনিকতার সংঙ্গা জানেন না। আর বড় কথা আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এই প্রক্যাশে মদ খাওয়াকে তেমন ভাবে সমর্থনও করে না।

যাইহোক, এতসব হাজারো চিন্তার মাঝে আমার বাস থেকে নামার সময় হয়ে গেল। আমি যেই নামতে যাচ্ছি ওমনি হেলপার এসে বলল, মামা! এবার ভাড়া দেন! আমি মুখে স্পষ্ট বিরক্ত হবার ভাব ফুটিয়ে তুলে বললাম, তোমগো মিয়া আসলে শোকর নাই। এতক্ষন ধইরা এত ফ্রি বিনোদন দিলাম, বাসের অর্ধেক পাবলিক বিনোদনের ঠেলায় কতদূর আইসা পড়ল, তাও আবার আমার কাছ থেইকা ভাড়া চাও? যাও এই লও দশ টেকা! আমি স্টুডেন্ড! হাফ ভাড়া।

হেলপার কিছুটা ভ্যাবাচেকা খাইয়া বলল, মা-মামা আপনেও স্টুডেন্ড??

আমি বলললাম, হ’রে মামা! এই জীবনে আরো কত কি যে দেখা বাকি, কত কি যে শেখার বাকি। এখনও শিখতাছি, তাই স্টুডেন্ট! এই বলে আমি একটা চোখ টিপি দিলাম, হেলপার একটা হাসি দিয়া ড্রাইভারকে হাঁক দিলেন, ওস্তাদ! ব্রেক করেন! মাল নামব!!

বাস থেকে নামার পড় হেলপারের দিকে তাকালাম। এবার সে আমাকে একটা চোখ টিপি দিল

——————————————————————-
বিড়ালের আক্রমনঃ
বাসায় এসে ছোট বোনদ্বকে ঘটনাটি শেয়ার করলাম। তারা কিছুটা না পারতেই জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা ভাইয়া, মেয়েটা দেখতে কেমন ছিল রে?
আমি বললাম, এই ধরনে বিকট ভাবে হা হয়ে ঘুমালে খোদ ক্যাটরিনাকেও একটা বদখত ‘ক্যাটের’ মতই লাগবে।
তারা কিছুক্ষন চুপ থেকে বলল, আচ্ছা ভাইয়া বল তো আমরা কি ঘুমানোর সময় হা হয়ে ঘুমাই?
আমি, না না তোমরা ঠিক আছো বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল দুইদিন আগে তারা আমার শার্ট খুঁজে দেয় নি। খুব দাম দেখিয়েছিল। সাথে সাথে আমি মুখটা গম্ভীর করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, তোরা নিশ্চিতে থাকতে পারিস। তোদের খোলা আর বন্ধ মুখে কোন পার্থক্য নেই রে! পুরোটাই ক্যাট ক্যাট।

তারপর আমার উপর দুইটা সুন্দর বিড়াল ঝাপিয়ে পড়ল। আমার বিপন্ন প্রায় মাথার চুল আরো খানিকটা বিপন্ন হলো, আমার শরীর বিড়ালদ্বরের খামচিতে আহত হলো। আমি চিৎকার করে আম্মাকে ডাক দিলাম। আম্মাআআআআআআআআআ! বাসা থেকে বিলাই তাড়াও!!!!!!






মন্তব্য চালু নেই