মেইন ম্যেনু

ছেলেদের জন্য মেয়েলি গল্প!

মেয়েদের যা কিছু গোপন, সে নিয়ে পুরুষের চিরদিনের কৌতূহল! সে কৌতূহল চেনা বাস স্টপের অদূরে দাঁড়ানো দুই অচেনা মেয়ের সলাজ কানাকানি হোক বা ভূগোল জানা মেয়ের শরীরী বাঁক-উপবাঁকের নিরিখে অন্তর্বাসের মাপ-জোক। একলা দুপুরে রিডিং রুমে উদ্ধার মেয়েলি হরফের চিঠি হোক বা, মাঝ রাত্তিরে ফেস-বুক-প্রাণার কবিতায় দেওয়া প্রোফাইল স্টেটাস!

মেয়েদের ভিতর-বাহির সবকিছু নিয়েই যেন প্রখর রুদ্র হতে চায় পুরুষ! ভিড় মেট্রোয়, উঠতি কুর্তির তলে চকিতে দেখে ফেলা, একুশের এক চিলতে ফর্সা শরীর নিয়ে যেমন তার কৌতূহল! ঠিক সেই রকম সে সমান কৌতূহলী, অফিস লিফটে নিরুপায় দূরত্বে দাঁড়ানো অন্য ফ্লোরের চুপচাপ প্রিয়দর্শিনীর সিঁথিতে স্বস্তিক ছাপ নিয়ে! এমনতরো সব মেয়েলি গল্প-গাছা-গোপনের দরোজা হাট মুহূর্তের কোলাজ, মৈনাক ভৌমিকের ‘চিক-ফ্লিক’ ‘আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস’।

aaag_stry একটি বাণিজ্যিক চিক-ফ্লিকের মধ্যে যা যা থাকার কথা, এ ছবিতে সেই ‘ইলসিট রিলেশন’, ‘ডেটিং বেসড স্টোরি লাইন’, ‘থিমেটিক ইউজ অফ কালার পিঙ্ক’, ‘মেকওভার’, সব-ই মজুত আছে। যাঁরা এই পরিচালকের ‘বেডরুম’ বা ‘মাছ মিষ্টি অ্যান্ড মোর’ দেখেছেন, সেই সব দর্শকরা জানেন, এসব উপাদানের মিলমিশে মেয়েলি মুহূর্তের গল্প বলায় টলিবাজারে এখন মৈনাকের জুড়ি মেলা ভার। তিনজন পুরুষকে সামনে রেখে মেয়ে-বেলার যে গল্প ‘বেডরুম’ এ শুরু হয়েছিল, তিনটি সংলাপে ‘বিপ বিপ’ আওয়াজ ও একটি দৃশ্য বাদ দিয়ে, সম্প্রতি মুক্তি প্রাপ্ত এ ছবি সেই মেয়েলি গল্পের-ই যেন হাতে হাত ছুঁয়ে দাঁড়ানো সহচরী চিত্রনাট্য। যেখানে তিন সখির কেউ গোলাপি প্যান্টি গলানোর চেষ্টা করে, জামা তুলে কেউ কমোডে বসে, পিঠ-গা-গতর-ঊরু চুলকায়। যেখানে তিন সখি মন্দারমণির সমুদ্রবেলায় বিকিনি পরে জলখেলায় দাপাদাপিতে মাতে।

গল্প এগিয়েছে তিন সখি- স্কুল কাউন্সেলর শ্রীময়ী (স্বস্তিকা), রেডিও জকি রিয়া (পার্নো) এবং লেখিকা প্রীনিতা (রাইমা)-র সুখ-দুঃখের সময়, ‘সেক্স অ্যান্ড দ্য সিটি’-র চোর(আ) স্রোতে। অথবা যেন মেয়েলি মনের মুহূর্তে সাজানো সার্কাস লে-আউটে! ঠিক বাংলা নয়, যে খিচুড়ি ভাষায় এই প্রজন্ম কথা বলে, সেই নব্য মিশ্র-ভাষায় কথা ও উপকথনের পিঠে সওয়ার ফ্রেমের এ ছবি যতক্ষণ দেখি, ভাল লাগে ঠিক ততক্ষণ-ই। দেখতে দেখতে মনে হয়, ‘বিড়ি জ্বলাই লে’-এর বিনোদন হয়তো নয়, কোথাও যেন চিক-ফ্লিকের চতুরালিতে ছেলেদের জন্য মেয়েলি গল্পের ছবি। বা, তিন শহুরে মেয়ের মেয়েলি মুহূর্তের গোপন ডকু বানিয়েছেন নবীন পরিচালক!

এ ছবি দর্শককে কোনও দৃশ্যের গভীরে নিয়ে যায় না। নিয়ে যায় না, বক্তব্যের সমর্থন বা বিরোধাভাসের বিরোধে। বিবাহিতা রমণীর ঝঞ্ঝাট কি শুধু তার পুরুষের যৌন-অক্ষমতা নিয়ে? ছবিতে ঘুরে ফিরে বার বার এসেছে শ্রীময়ীর স্বামী সুপ্রতীক (নীল)-এর একক ও যুগলের সেই সংক্রান্ত ক্লান্তিকর দৃশ্য ও অ-শ্রাব্য। অবদমিত কাম পিপাসা মেটাতে শ্রীময়ী যখন তার যোল বছরের স্কুল ছাত্র (অনুব্রত)-কে দাঁড় করায়, মনে পড়ে যায় পরিচালকের দ্বিতীয় ছবি ‘বেডরুম’-এর ফ্যাশন ফটোগ্রাফার ঋত্বিকা (পার্নো)-র কথা। সেখানেও দর্শক দেখেছিল, জয় (রাহুল)-এর শিথিলতায় ঋত্বিকা গিয়ে উঠেছিল তার থেকে বয়েসে ছোট এক যুবক (অনুব্রত)-এর বিছানায়! অন্যদিকে ‘বেডরুম’-এর বিবাহিত যুগল পাওলি ও আবীরের যে দাম্পত্য সম্পর্কের শৈথিল্য তা যেন ‘আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস’-এ শ্রীময়ী-সুপ্রতীকের সম্পর্কের ধরতাই! এমন দৃশ্য ও চরিত্রের পুনরাবৃত্তির রেফারেন্স পরিচালকের ‘মাছ মিষ্টি এন মোর’-এর থেকেও নেওয়া যায়। একজন পরিচালকের পরপর ছবিতে যখন একই বিষয়, একই চরিত্র, একই সংলাপের ঘূর্ণিতে বার বার ঢুকে পড়েন, তখন সেই রিপিটেশন পর্দায় দর্শকের কাছে একঘেয়ে মনে হয়! সাহিত্যে বোধহয় একেই বলে, পুনুরুক্তি বদভ্যাস! সিনেমায়?

পরিচালকের উদ্দেশ্য যাই থাক, স্বস্তিকা, রাইমা এবং পার্নো তিনজনেই চরিত্র নির্মাণে বেশ সফল ছবিতে। রিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেছেন পার্নো। রিয়া বোকা এবং পুরোদস্তুর চাইল্ডিশ, খানিকটা ডেসপারেট-ও। চরিত্রের এই সবগুলোর ডিটেলিং-এ পার্নো বেশ পরিণত। রিয়ার পরামর্শদাতা পুরুষ ও প্রেমিক দীপের চরিত্রে বিক্রম বেশ মানিয়ে যায়। শ্রীময়ীর মদ্যপ, ল্যাদখোর স্বামীর চরিত্রে নীলও ঠিকঠাক। একটু আড়ষ্ট মনে হলেও, বিশ্বনাথের অভিনয় চরিত্রের সঙ্গে মন্দ লাগে না। চরিত্র বিশ্লেষণের কোনও সৌরভ মিলল না স্কুল ছাত্রের চরিত্রে অনুব্রত-র কাছে। টলিপাড়ার এই শিল্পীর সবকটা ছবি পরপর দেখলে মনে হয়, সেও যেন ‘টাইপ’ চরিত্রের ঘানি চক্করে ঢুকে পড়েছে!

এমনতরো সব নেতির কথা বলার পর, এ ছবিতে যা প্রশংসার দাবি রাখে, সে হল অভীক মুখোপাধ্যায়ের সিনেম্যাটোগ্রাফ্রি। মন্দ লাগে না নীল দত্তর সঙ্গীত। এবং চিক-ফ্লিকের যোগ্য সঙ্গতে, প্রশংসার দাবি রাখে পরিচালকের শিল্প-নির্দেশনা।

শেষ বিচারে একটি কথাই বলার, মৈনাকের ছবি ও সেন্সর বোর্ডের কূটকচালির ‘পালা’- নিয়ে যে পরিমাণ চর্চা হল, সে ছবি দেখতে বসে মনে হয়, আর যাই হোক ‘আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস’ সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’ অথবা কোণার্ক-খাজুরাহের শিল্পকর্ম নয়। সুতরাং প্রজাপতি মামলায় বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যে পিওরিটি প্রসঙ্গে সেই বিখ্যাত উক্তির উত্থাপন করাটাই নিছক বাতুলতা!

পরিচালনা : মৈনাক ভৌমিক
প্রযোজনা : অনির্বাণ আদিত্য
সঙ্গীত : নীল দত্ত
অভিনয় : স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, রাইমা সেন, পার্নো মিত্র, নীল মুখোপাধ্যায়, অনুব্রত বসু, বিক্রম প্রমুখ।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা।






মন্তব্য চালু নেই