মেইন ম্যেনু

গ্রিসের রবিনহুড

রবিনহুডের কথা মোটামুটি কমবেশি সবাই জানেন। একজন চোরও যে সমাজের নিপীড়িত মানুষের চোখের মনি হয়ে উঠতে পারে তার প্রমাণ নটিংহিলের রবিনহুড। এমন একটা সময়ে রবিনহুডের উত্থান হয়েছিল যখন গোটা দেশজুরে রাজতন্ত্রের শোষণ তার স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে সীমা অতিক্রম করেছিল। গরীব হয়ে যাচ্ছিল আরো গরীব, আর ধনী হয়ে উঠছিল আরো ধনী। এমনই এক অবস্থায় গরীব-খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে ধনীদের গোলা লুট করতে শুরু করেন রবিনহুড নামের এক চোর। আর ধনীদের কাছ থেকে লুট করা ধন সম্পদ গরীবদের মাঝে বিলিয়ে সেই চোর হয়ে গেল রাতারাতি গরীবের বন্ধু রবিনহুড। তাকে কেউ ধরতে পারে না, ছুতে পারে না।

এতো গেল ইংলিশ কথাসাহিত্যের কথা। কিন্তু বাস্তবেই যে এক রবিনহুড গোটা গ্রিসের ঘুম কেড়ে নিয়েছে তার খবর কজন রাখি। ২০১০ সালে যখন গ্রিস দেনার দায়ে দেউলিয়া হয়ে গেল, রাষ্ট্রায়ত্ব সকল ব্যাংকগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল তারও আগ থেকেই গ্রিসে আর্বিভূত হন নব্য রবিনহুড। ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে একই দিনে দুইটি ব্যাংক লুট করে সেই চোর। মোট দুই লাখ ৪০ হাজার ইউরো নিয়ে স্রেফ গায়েব হয়ে যান তিনি। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক মিলিয়ন ইউরো লুট এবং বেশ কয়েকজন শিল্পপতিকে অপহরণ করে অর্থও আদায় করেন এই ডাকাত। আর এরপর থেকেই এই রবিনহুড খ্যাত চোরকে ধরার জন্য গোটা ইউরোপ জুরে ঘোষিত হয়েছে রেড অ্যালার্ট। তবে হাজার রেড অ্যালার্ট ও তার মাথার মূল্য নির্ধারণ করেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

তবে সাহিত্যের রবিনহুডের মতোই গ্রিসের রবিনহুড ভ্যাসিলি পালেওকসতাস’ও গরীব মানুষের পাশে দাড়ান। আর তাতেই প্রশাসনের মাথাব্যথার শুরু। ভ্যাসিলি ১৯৬৬ সালে গ্রিসের মসকোফাইতো নামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মান। তিনি শৈশব থেকেই যেমন ছিলেন ডানপিটে তেমনি জনদরদী। যার প্রমাণ পাওয়া যায় তারই গ্রামের চার্চের প্রধান পুরোহিতের বক্তব্যে, ‘ভ্যাসিলি হয়তো একজন চোর, কিন্তু সে মোটেও অপরাধী নয়’। ১৯৭৯ সালে ভ্যাসিলির পরিবার ত্রিকালা শহরে স্থানান্তর করে। সেখানে নতুন করে জীবনযাত্রা শুরু হয় ভ্যাসিলির। শহরের একটি পনির কারখানায় কাজ শুরু করেন তিনি। কারখানার জানলা দিয়ে সেই বয়স থেকেই তিনি গ্রিসের অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এক সকালে তিনি কারখানা থেকে বের হয়ে যান, এবং আর কোনোদিন ফিরে আসেননি।

এরপর জীবনের তাগিদে গ্রিসের চলচ্চিত্রাঙ্গনে স্ট্যানম্যানের কাজও করেছেন তিনি। কিন্তু এতকিছুর মাঝেও তিনি মনে মনে ছক আঁকছিলেন কিভাবে শুরু করবেন। আর সেই সুযোগও পেয়ে গেলেন একদিন। তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় কস্তাস সামারস নামের এক ব্যাক্তির, যিনি নিজেকে একজন শিল্পী বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। সামারসের নিখুত পরিকল্পনা আর ভ্যাসিলির সাহস দুয়ে মিয়ে বিভিন্ন জুয়েলারি ও ব্যাংকে ডাকাতি করতে শুরু করে তারা।

তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশ বিফল হওয়ার পর নিয়োজিত হলো বিশেষ গোয়েন্দা বাহিনী। এই গোয়েন্দা দলের প্রধান ছিলেন গ্রাভানি। গ্রাভানির ভাষায়, ‘তদন্তের জন্য যখন আমি গ্রামে গ্রামে ঘুরছি, তখন তার সঙ্গে আমার দেখাও হয়েছিল। সে আমাকে একটি শূকর মেরে খাইয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে চিনতে পারিনি। আর তাকে গ্রেপ্তার করা এক কথায় অসম্ভব কারণ সে যে অর্থ চুরি বা ডাকাতি করে তার পুরোটাই গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। যে কারণে সাধারণ মানুষ তার বন্ধু। আর সাধারণ মানুষের মাঝ থেকে ভ্যাসিলিকে খুঁজে বের করা সত্যিই কষ্টের।’

১৯৯০ সালে ভ্যাসিলি তার ভাইকে কারাগার থেকে উদ্ধার করতে গেলে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তবে বেশিদিন তাকে আটকে রাখা যায়নি। ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাকে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন ভ্যাসিলি পথ খুঁজছিলেন চালকিদা কারাগার থেকে বের হওয়ার। কারাগার কর্তৃপক্ষের দেয়া বিছানার চাদরকে দড়ি বানিয়ে কারাগারের দেয়াল ডিঙিয়ে পালিয়ে যান তিনি।

১৯৯২ সালে সামারসের পরিকল্পনায় ভ্যাসিলি ও তার দল আরও একটি ব্যাংক লুট করেন। আর সেই ব্যাংক থেকে তারা লুটে নিয়ে যান প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড। গ্রিসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যাংক ডাকাতি বলা হয় এই ঘটনাকে। এরপর ১৯৯৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর মাল্টিবিলিওনার শিল্পপতি আলেকজান্ডার হেইতিগোলুকে অপহরণ করেন ভ্যাসিলি ও তার দল। সাত লাখ ১৪ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে তাকে পরবর্তীতে মুক্তি দেয়া হয়। এই ঘটনার পরবর্তী সময়ে গ্রিস পুলিশ ভ্যাসিলির মাথার দাম নির্ধারণ করেন ২৫০ মিলিয়ন ড্রাকমা। যদিও ভ্যাসিলিকে ধরা চাট্টিখানি কথা নয়। কারণ সেই দুর্দান্ত চোর-পুলিশের সময়েও ভ্যাসিলি কিছু অনাথ বাচ্চাদের এক লাখ ড্রাকমা দিয়েছিলেন।

১৯৯৯ সালের ২০ ডিসেম্বর এক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন ভ্যাসিলি। আর এই দুর্ঘটনার কারণেই তাকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হতে হয়। আহত অবস্থায় তিনি যখন পুলিশকে বলছিলেন, ‘কাউকে বলো না আমি কে, আমিই ভ্যাসিলি পালেওকসতাস।’ অবশ্য ভ্যাসিলির এই কথায় তৎক্ষণাত বিশ্বাস করতে পারেনি স্থানীয় পুলিশ। তাই সন্দেহ নিয়ে সদরদপ্তরে খোঁজ লাগায় পুলিশ। সদরদপ্তরে পুলিশ জানায়, ‘আমরা মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত একজনকে পেয়েছি। সে বলছে যে গ্রিসের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় তার নাম শীর্ষে।’






মন্তব্য চালু নেই