মেইন ম্যেনু

গাড়ি ছিনতাইয়ের ১৬ কৌশল

যশোর ও সাতক্ষীরার সীমান্তে চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রির হাট বসে। আর এসব হাটের মোটরসাইকেলের যোগান আসে সীমান্তের দুই দিক থেকেই। ভারতীয় চোরাই মোটরসাইকেলের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা থেকে আসে সেকেন্ডহ্যান্ড মোটরসাইকেল। এই বাণিজ্য টিকিয়ে রেখেছে শতাধিক চোর চক্র।

শুধু মোটরসাইকেল নয়, প্রাইভেটকারসহ সব ধরনের গাড়িই চুরিতে সিদ্ধহস্ত এই চক্র। ৩০ সেকেন্ড থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে যে কোনো ধরনের তালা ভেঙে গাড়ি নিয়ে সটকে পড়ে এসব চক্রের সদস্যরা। সম্প্রতি সীমান্ত এলাকায় মোটরসাইকেল বাণিজ্য চালানো একটি চক্রকে শনাক্ত করেছে রাজধানীর মিরপুর থানা পুলিশ। ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে মিলেছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য।

এদিকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, গাড়ি চুরি ও ছিনতাইয়ের পর মুহূর্তেই নম্বরপ্লেট, রঙসহ গাড়ির খোলনলচে বদলে ফেলে চোরচক্র। এরপর গোপনে বিক্রি হয় পুরনো গাড়ির বাজারে। কিছু গাড়ি চলে যায় সীমান্ত এলাকায়। কিছু গাড়ি পাঠানো হয় প্রত্যন্ত মফস্বল এলাকায়। অনেক গাড়ির নম্বরপ্লেট বদলে চালানো হয় রাজধানীতেই।

চোরাই গাড়ির জাল কাগজপত্র তৈরি করতে সহযোগিতা করে বিআরটিএর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা। যশোর ও সাতক্ষীরায় রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের গুদাম। সেখান থেকেই গত ৭ জুলাই পুলিশ ২২৫টি চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার করে। গ্রেপ্তার করা হয় চোর চক্রের একটি গ্রুপের দলনেতা আশিকুর রহমান ও মনিরা রহমানসহ ১৫ জনকে।

সূত্র জানায়, গত ছয় মাসে সারাদেশে সাত হাজার গাড়ি চুরি ও ছিনতাই হয়। রাজধানীতে একই সময় প্রায় চারশ’ গাড়ি ছিনতাই/চুরির অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। মামলায় হয়েছে ৩৮৮টি।

গাড়ি চুরি ছিনতাই বেড়ে যাওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এক কমিটি গঠন করে গাড়ি চুরি ও ছিনতাই রোধ করতে তাগিদ দেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস এমনকি মাল বোঝাই কাভার্ডভ্যানও চুরি/ছিনতাই হয়। এখন সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের টার্গেট দামি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল। গত ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গাড়ি উদ্ধার করেছি আমরা। পেশাদার চক্রগুলোকে ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। গাড়ি চুরি ঠেকাতে গাড়ির মালিকদের সিকিউরিটি ডিভাইস লাগানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ডিভাইস লাগানো থাকলে চুরি বা ছিনতাই হলেও এটি উদ্ধার করা সহজ হয়।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘উদ্ধার করা ২২৫টি মোটারসাইকেলের বেশিরভাগই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চুরি/ছিনতাই হয়েছে। সংঘবদ্ধ চক্রের আরো অনেক সদস্যের নাম পাওয়া গেছে। তাদেরকেও গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে।’

মিরপুর থানায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ রাসেল জানান, ‘চক্রের হোতা আশিকুরের বাড়ি যশোর আর মনিরার বাড়ি সাতক্ষীরায়। গ্রেপ্তার অন্যদের বাড়িও যশোর এবং সাতক্ষীরায়। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় একাধিক দলনেতার নেতৃত্বে রয়েছে এমন অনেক গ্রুপ।’

এসআই রাসেল আরও বলেন, ‘সাতক্ষীরার নাজমুল সরণি, কাটিয়া বাজার রোডে একাধিক ছিনতাই চুরির গাড়ি বিক্রির হাট রয়েছে। এছাড়া যশোর সীমান্তেও চোরাই গাড়ি বিক্রি হয়।’

## সক্রিয় শতাধিক দুর্ধর্ষ চক্র :
গেয়েন্দা সূত্র জানায়, সারাদেশে শতাধিক চক্র গাড়ি চুরিতে সক্রিয়। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রুপ চুরি, ছিনতাইয়ের সময় খুনোখুনিও করে। এরা ডাকাতিও করে। গাড়ি চোর চক্রের মধ্যে- জামান গ্রুপ, রিপন গ্রুপ, হাবিল গ্রুপ, বাশার গ্রুপ, রাসেল গ্রুপ, মিজান গ্রুপ, আমির গ্রুপ, শাহিন গ্রুপ, বিশাল গ্রুপ, আসাদুল গ্রুপ, জুয়েল গ্রুপ নজরুল গ্রুপ, মিরাজ গ্রুপ, কাজল গ্রুপ, বাবু গ্রুপ, রনি গ্রুপ, লম্বু শহীদ গ্রুপ, পারভেজ গ্রুপ, রাজ গ্রুপ, শাহ আলম গ্রুপ, জহির গ্রুপ, রাজু গ্রুপ, সিরাজ গ্রুপ, ফিরোজ গ্রুপ, রফিক গ্রুপ অন্যতম। সংঘবদ্ধ এই চক্রের সদস্যরা বারবার গ্রেপ্তার হচ্ছে। ধরা পড়ার পর কিছুদিন কারাগারে থেকে সহজেই আদালত থেকে জামিন পাচ্ছে। কারাগার থেকে বের হওয়ার পরই আগের ‘পেশায়’ ফিরে যাচ্ছে।

## গাড়ি চুরির ১৬ কৌশল :
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গাড়ি চুরির নানান কৌশল জানা গেছে। চোর সিন্ডিকেট যেকোনো গাড়ি ছুরি বা ছিনতাই করার আগে অন্ততপক্ষে পাঁচবার ওই গাড়ি সম্পর্কে খোঁজ নেয়। সংঘবদ্ধ চক্রের কয়েকজন মিলে টার্গেট করে গাড়িটির গতিবিধি লক্ষ্য করতে থাকে। এরপর গাড়িটি দখলে নেয়। এছাড়া তারা মার্কেটে, বাড়ির সামনে কিংবা কোনো স্থানে পার্ক করার পর চালককে অস্ত্রের ভয় কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে গাড়িটি ছিনিয়ে নেয়। গাড়িটি দখলে নেয়ার পরপরই কোনো ওয়ার্কশপ কিংবা ঢাকার বাইরে কোথাও পাঠিয়ে দেয় তারা। সেখানে গাড়ির রঙ, নম্বরপ্লেট, চেচিস নম্বর, ইঞ্জিন নম্বর পরিবর্তন করে। এরপর সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের দিয়ে গাড়ি বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজতে থাকে।

চুরির প্রথম কৌশল হিসেবে চক্রের সদস্যরা ব্যবহার করে ‘মাস্টার চাবি’। প্রতিটি গ্রুপে কাজ করে কমপক্ষে সাতজন সদস্য। তাদের মধ্যে একজন রয়েছে চাবি বিশেষজ্ঞ। গাড়ির লক খোলার জন্য বিশেষজ্ঞ কাজ করে। বাকি সদস্যরা তার নিরাপত্তায় থাকে। এক মিনিটের মধ্যেই ৯০, ১০০ ও ১১০ মডেলের গাড়ির লক খুলে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ফেলে। সিগনাল পেয়ে বাকি সদস্যরা গাড়িতে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি নিয়ে হাওয়া হয়ে যায় তারা।

শপিংমল, হাসপাতাল ও রেস্টুরেন্টের মতো ব্যস্ততম এলাকায় ওঁৎ পেতে থাকে চাবি সিন্ডিকেট। মাঝে-মধ্যে গাড়ির মালিক একা দূরে কোথাও গেলে সহযোগীদের জানিয়ে দেয়। এছাড়া বিআরটিএ অফিসে যাওয়ার কথা বলে চালককে গাড়িতে তোলে প্রথমেই তারা স্টিয়ারিংয়ে বসে পড়ে। সুযোগ মতো চালককে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। যাত্রীবেশে নারীদের গাড়িতে ওঠানো হয়। লোক সমাগমের স্থানে সুন্দরী নারীদের ব্যবহার করে প্রাইভেটকার থামানো হয়, টাই পরা ভদ্রবেশী লোকেরা রেন্ট-এ-কার থেকে গাড়ি ভাড়া করে গ্রামের বাড়িতে যায়। পথে সুবিধাজনক স্থানে চালককে মারধর করে ছিনতাই করে।

অভিজাত হোটেলের সামনে অবস্থান নিয়ে যাত্রী বা মালিককে নামিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে চক্রের সদস্যরা অস্ত্রের মুখে চালককে জিম্মি করে। এভাবে ১৬ কৌশলে গাড়ি ছিনতাইয়ের তথ্য পাওয়া গেছে গ্রেপ্তার ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে।

গাড়িচোর চক্রের সদস্যদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ দাবি করছে, গাড়ি চোর চক্রের সঙ্গে রাজধানীর ১৭টি গাড়ির শো-রুমের মালিকদের সুসম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন বাড়ি ও গ্যারেজের দারোয়ান, চালক ও হেলপারও গাড়ি চুরি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই