মেইন ম্যেনু

আনন্দবাজারের প্রতিবেদন

কলকাতায় বাংলাদেশের গোয়েন্দারা : খুঁজবেন জাওয়াহিরির জাল

বর্ধমান বিস্ফোরণ তদন্তের ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়ার পর এবার কলকাতা গেল বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা দল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতা পৌঁছে সাত সদস্যের ওই দলটি। এ সফরে ভারতে পালিয়ে থাকা জেএমবির জঙ্গিদের বিষয়ে এনআইএর সঙ্গে আলোচনা করার কথা রয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ খুন করে জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর পালিয়ে যাওয়া জেএমবি সদস্যদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেবেন গোয়েন্দারা। তবে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার বলছে, হায়দরাবাদের আটক রোহিঙ্গা নাগরিক খালিদ মহম্মদকে জেরা করাই মূল লক্ষ্য। এর মধ্যদিয়ে আল কায়েদার জাল খুঁজবেন তারা।

শুক্রবার প্রকাশিত আনন্দবাজারের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হায়দরাবাদে ধৃত জঙ্গি মায়ানমারের নাগরিক খালিদ মহম্মদকে জেরা করতেই মূলত ঢাকা থেকে কলকাতায় উড়ে এলেন বাংলাদেশের ৭ গোয়েন্দা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতা বিমানবন্দর নেমেই তারা সল্টলেকে এনআইএ’র দপ্তরে যান। আল কায়দার জঙ্গি-জাল সম্পর্কে সবিস্তার তথ্য সংগ্রহই আপাতত তাদের পাখির চোখ।

তবে কলকাতা যাওয়ার আগে এ সফরের কার্যক্রম নিয়ে কোনো ব্রিফ করেনি পুলিশ। গতকাল ঢাকায় অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের বিষয়ে ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকরা কলকাতা সফরে বিষয়ে প্রশ্ন করলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘গত ক’দিন আগে এনআইএ বাংলাদেশে এসেছিল। তখন তারা আমাদের বেশ কিছু তথ্যও দিয়েছিল। পাশাপাশি আমাদের কাছ থেকেও কিছু তথ্য চেয়েছিল। সেই তথ্য দেয়া এবং নতুন কোনো তথ্য তাদের কাছে আছে কি না সে বিষয়ে আলোচনা করতেই এই সফর।’

তিনি আরো বলেন, ‘ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা ও শিমুলিয়া মাদরাসায় বোমা তৈরির ব্যাপারে কিছু তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করবো। একই সঙ্গে আমাদের অনুমান, বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার জেএমবি সদস্যসহ অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন জঙ্গি ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন। এসব জঙ্গিদের ধরার ব্যাপারে এনআইএর সঙ্গে আলোচনা হবে।’

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখানে (বাংলাদেশে) জঙ্গি নিধন অভিযান চালালে কোনো জঙ্গি যেন পালিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও এনআইএর সহযোগিতা চাওয়া হবে।’

সফর সম্পর্কে আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, জঙ্গি সংগঠন জেএমবির (জামাআ’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ) পশ্চিমবঙ্গ শাখার আমির (রাজনৈতিক প্রধান) সাজিদ ওরফে মাসুদ রানাও ধরা পড়ে এখন এনআইএ’র হেফাজতে রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার ও গোয়েন্দা প্রধান মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে কলকাতায় আসা দলটি তাকেও জেরা করবে। সাজিদের স্ত্রীকে ইতিমধ্যেই ঢাকার উপকণ্ঠ থেকে গ্রেপ্তার করে জেরা করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণস্থল ও সাজিদের আস্তানা শিমুলিয়ার মাদরাসাতেও যাবেন ঢাকা থেকে আসা গোয়েন্দারা। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশের এক শীর্ষ সূত্র জানাচ্ছে, এ সবের কোনোটিই তাদের অগ্রাধিকার নয়। হায়দরাবাদ থেকে ধরা পড়া খালিদকে জেরা করতেই প্রধানত কলকাতা দৌড়েছেন তাদের বাছাই করা গোয়েন্দারা।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, মায়ানমারের নাগরিক খালিদকে জেরা করে পাওয়া তথ্য বাংলাদেশ পুলিশকে জানিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। তার ভিত্তিতে চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশ পুলিশ পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। কক্সবাজারের একটি হোটেলে বৈঠকে বসেছিল এরা। এদের মধ্যে মহম্মদ আলম নামে একজন পাকিস্তানের নাগরিক, দু’জন মায়ানমারের। বাংলাদেশের গোয়েন্দারা বলছেন, এই পাঁচজনকে জেরা করেই তাদের ঘুম ছুটে গিয়েছে। জেরায় পাওয়া তথ্য তারা এনআইএকেও পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেই তথ্য থেকেই হদিস মিলেছে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ জুড়ে এক বড়সড় জঙ্গি জালের, যার মাথায় রয়েছে আয়মান আল জাওয়াহিরির নেতৃত্বাধীন আল কায়দা।

জাওয়াহিরি সাম্প্রতিক একটি ভিডিও বার্তায় ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের শাখা খোলার কথা ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে আনন্দবাজারে দাবি, বাংলাদেশ পুলিশ ও এনআইএ’র ধারণা চট্টগ্রামের পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করে আল কায়েদার সেই শাখারই টিকির সন্ধান পেয়েছেন তারা। আরব ও ইউরোপের কিছু দেশের নাগরিক ও সংগঠনও এই চক্রান্তে জড়িত। আর খালিদ নিজে সরাসরি আল কায়েদার নিয়োগ করা জঙ্গি। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাকে ভারতে পাঠানো হয়েছিল স্থানীয় স্তরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন জঙ্গি মডিউলগুলিকে প্রশিক্ষণ দিতে। শিমুলিয়া মাদরাসায় এসে খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণে নিহত শাকিলকেও সে সরাসরি প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।

খালিদ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ভুক্ত মায়ানমারের নাগরিক। রোহিঙ্গাদের বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। কখনো মায়ানমারে, কখনো মায়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশের কোনো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শিবির চালায় রোহিঙ্গারা এরকম তথ্যও বাংলাদেশের পক্ষে উড়িয়ে দেয়া যায় না। ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি, এ ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে খালিদের। পরে তাকে ভারতে পাঠায় আল কায়েদা।

গোয়েন্দারা জেনেছেন, দু’বছর আগে ভারতে এসে হায়দরাবাদে বসবাস করতে থাকে খালিদ। শিমুলিয়া ছাড়া ভারতের আরও অন্তত চারটি জায়গায় সে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে খালিদকে জেরা করে জানতে পেরেছে এনআইএ। কিন্তু এর মধ্যে একাধিক বার সে বাংলাদেশেও এসেছে বলে এদেশের গোয়েন্দারা জেনেছেন। চট্টগ্রামে জঙ্গিদের একটি বড়সড় আঞ্চলিক শাখা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ছিল জঙ্গিদের। সে কাজে টাকাকড়ির জোগান অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা সাজাতেই কক্সবাজারের হোটেলে বৈঠকটি চলছিল।

আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের নাগরিক মহম্মদ আলম ‘গ্লোবাল রোহিঙ্গা সেন্টার’ নামে নেদারল্যান্ডসের একটি এনজিওর পরিচালক। অতি সম্প্রতি ভারতেও শাখা খুলেছে এনজিওটি। বাংলাদেশেও অফিস খুলতে চেয়ে তারা আবেদন জানিয়েছে। কয়েকটি আরব দেশ থেকে আসা অর্থ এই এনজিওটি জেহাদি সংগঠনগুলোর কাছে বিলি করে বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন। বৈঠকে হাজির সফিউল্লা নামে এক রোহিঙ্গা আবার বাংলাদেশের শাসক দলে স্থানীয় স্তরে নাম লিখিয়ে রেখেছে। সে এবং অন্য একজন বাংলাদেশি রোহিঙ্গা সলিডারিটি নামে একটি সহায়ক সংগঠনের নেতা। অন্য দুই ধৃত মায়ানমারের নাগরিক এবং সেখানকার দু’টি রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠনের মাথা।

কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের দলটিতে থাকা সদস্যরা প্রত্যেকেই এই পাঁচ জনকে জেরা করেছেন বলে আনন্দবাজারে প্রতিবেদনে জানা গেছে। পত্রিকাটির দাবি, খালিদকে জেরা করে আরো তথ্য পেতে চান বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। এনআইএ সূত্রে জানা গেছে, খালিদ ইতিমধ্যেই ভারতীয় গোয়েন্দাদের জেরায় ভেঙে পড়ে অনেক তথ্য দিয়েছে। বাংলাদেশি গোয়েন্দারা রোহিঙ্গাদের জঙ্গি সংগঠনগুরোর বিষয়ে অনেক বেশি ওয়াকিবহাল। তারা খালিদকে জেরা করে উপমহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে দেয়া আল কায়েদার জঙ্গি জাল ও তাতে অর্থ জোগানের বিষয়ে আরো তথ্য বের করতে পারবে বলে আশা করছে এনআইএ।






মন্তব্য চালু নেই