মেইন ম্যেনু

এ লাশ আমার

ওমা দেইখ্যা যাও, আমার বড়শীতে বড় একটা শ্যইল মাছ ধরছে, মা ওমা…..

রান্না ঘরে আতুরি বেগম টুকিয়ে আনা হেলেঞ্চা শাক কুটছে। দুইফোঁটা সর্ষে তেল দিয়ে ভেজে মা-বেটী দুপুরে ভাত খাবে। মেয়েটার চিৎকারে তার মেজাজ ছিট্কে ওঠে, তাতানো কড়াইতে জল তেলের ফোঁটা পড়ার মতো। আতুরি বেগম রান্না ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে। দাঁত মুখ খিঁচে বলে হারামজাদী চিল্লাস্ ক্যান? তোর চাচায় টের পাইলে অহনই বাড়ি ছাড়া করবো। জানস্না তোর বাপে তোর চাচার কাছে ঘর-বাড়ি, জমি-জমা বন্ধক রাখছে। পুকুরের অংশও বাদ রাখে নাই। মরণ অহন আমার।

শ্যইল মাছটাকে এতোক্ষণে ছালেহা ফ্রকের কোচড়ে লুকিয়ে ফেলে। ছালেহা দৌড়ে এসে মার সামনে মাছটা ফেলে দেয়।
এদিক ওদিক তাকিয়ে আতুরি বেগম নিশ্চিত হয়ে মাছটার ঘাড়ে পিড়ি দিয়ে আঘাত করে। মাছটা আস্তে নিস্তেজ হয়ে যায়। চুলার ছাই তুলে দ্রুত কেটে কুটে পাতিলে তুলে রাখে আতুরি বেগম।

রান্না ঘরে, দাদার আমলের একটা ঢেকি আতুর হয়ে আছে। ঢেকির মাথায় ছালেহা বসে মায়ের কাজ সামলানো দেখছে। এক সময় মনে হয় মার মেজাজের তিরিক্ষি ভাবটা থিতু হয়ে আসে। এবার মাকে প্রশ্ন করে, মা বাজান কি আর আইবোনা কোনদিন?
ঐ ঐ ছেমরি মরা মানুষ দুইন্যাইত ফিরা আহে শুনছিস্ কোন সময়?
তুমি দেখছ? আমরা কেউ দেখছি? বাজান যে সাততলা দালান থেইক্যা পইড়া মরছে?
মরছে দুবাই। বেক্কল মাইয়া, আমরা দেখমু কেমনে?
যারা কয়, হেরা যদি মিছা কয়?
চুপ কর। যা হাত পরিষ্কার কইরা ত্বরা ত্বরি গোসল সাইরা আয়। আমার বহুত কাম বাকি।
বাজানের কথা জিগাইলে খালি ধমক মার? বাজান কি তোমার শত্রু আছিল?

হ, হ শত্রু। চিৎকার করে ওঠে আতুরি বেগম। হে আমার জানের শত্রু, আমি আইজ জমিনহারা, বাড়িহারা। আমারে ফকির বানাইছে। দুবাই কামাইবো, একটা খেদ উগরে দেয় আতুরি বেগম।

এবার হাতের কাজ ছেড়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। ছালেহা ঢেকি ছেড়ে উদোম রসুই ঘরের বাঁশের পালা ধরে মার সাথে সাথে চোখের পানি ফেলে। দু’জনের চোখে একই জল ভিন্ন অনুভূতি। একজনের ক্ষোভ, অন্যজনের দুঃখ।

গত দুবছর আতুরি বেগম ক্ষেতের ফসল পায় না। দেবরের বউ বলে, পুকুর অহন আমাগো, মাছ চাও কেমনে? এমনকি নিজ ঘরের সামনের মাচায় উঠানো পুঁইশাকও তুলতে পারে না। গোবর মাটি দিয়ে কত যতœ করে তুলেছিল সেই লতাপাতা। দেবরের আদেশ, কিছুতেই হাত দিবা না। সব আমার। আতুরি বেগম শীতল পাটি বোনে, নক্শি কাঁথা বানায়, পরের ঘরে কাজ কাম করে। বেলা শেষে এক পেটের ভাত এনে দুজনে ভাগ করে যায়। দেবরের কারণে কারো সহানুভূতিও জোটে না। পরিচিত পরিবেশ যেন দিন দিন পর হয়ে যায়। একটা অভিমানের বিষফোড়া সব কিছু যন্ত্রণাময় করে দেয়।
একদিন মাকে প্রশ্ন করে ছালেহা, মা বাজানের লাশটা হেরা দিল না ক্যান?

মা পাটি বুনছিল আনমনে। চোখ না তুলেই বলে, হ কারা য্যান জিগাইছিল। লগে কইলো লাখ টেকা লাগবে। লাখ টেকা! কই পামু। যে মানুষটা আমারে রাস্তার ফকির বানাইলো হের লাশ দিয়া কি করুম আমি?

মার স্বরে একটা অভিমানের বিস্তার। ছালেহা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। বুঝতে পারে মাকে আর রাগানো ঠিক হবে না।
ছালেহা মার সামনে বসে বেত্তা তুলতে থাকে। দুতিন বার চেষ্টা করেও মার মতো করে তুলতে পারে না। মা দেখিয়ে দেয় এ এভাবে, নরম হাতে বেত্তা তুলতে হয়। কাম শিখতে দোষ নাই। দুই চাইর খান ভাঙ্গবই।

ছালেহার মনে হয় মার মনের ভেতরটা শান্ত হয়ে আসছে। আস্তে করে বলে, আমার ক্যান জানি মনে অয়….
হারামজাদী আবার তোর হেই কথা? মরুভূমির মাডির তল থেইক্যা তোর মরা বাপ ফির‌্যা আইবো? আমাগো উদ্ধার করবো?

উঠ্ ল। গাট্টিবাইন্দা তৈয়ার হ। কালকা তোর চাচায় কি কইলো? বেবাক জায়গা জমিন, ঘর, ঘরের ভাঙা খুঁটাটাও হের। কই কেউতো হক কথাডা কইলো না। তোর বাজানে সম্পত্তি বিক্রি করে নাই। আমাগো ঘরে আমাগো থাকনের অধিকার আছে। কতজনের পায়ে ধরলাম, কেউ হুনলো না আমাগো কথা। মারে, দুইন্যাইত গরীবের পক্ষে কেউ নাইরে মা। এতদিন মনে করছিলাম চাইর দিকে কত আপন মানুষ, আইজ কি দেহি? এই অইলো আযাবের দুনিয়া। আমার শখের কাঁঠাল গাছটাও য্যান পর অইরা গেল। মার কান্না নিমিষেই থেমে যায়। মেয়ের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে কি যেন ভাবে।

আতুরি বেগম কানের রিং জোড়া বিক্রি করে স্থান নেয় ঢাকা শহরের বস্তীতে। তিন বাড়িতে বুয়ার কাজ। থালা বাসন মাজা, ঘরদোর পরিষ্কার করা। অশিক্ষিত পল্লীবালার কপালে আর কি জোটে। বস্তির হাল অবস্থা দেখে ভাবনায় পড়ে। উঠতি বয়েসী ছালেহাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার ঘেরে ডুবে থাকে সারাক্ষণ। তের বছরের বাড়ন্ত মেয়েটি এ বস্তীতে বড় বেমানান। পাশের ঘরের আনিছা, রাবেয়া ওর সমবয়েসী। তিনজনের এক সাথে চলাফেরা। ওদের বাবা রিক্সা চালায়। মা আর সন্তানদের নিয়ে সারা দিন ব্যস্ত। কাঁই-কুঁই সংসার। আতুরি বেগম কিছুটা স্বস্থি পায় ছালেহার সঙ্গিদের নিয়ে। কদিন পর আনিছা, রাবেয়া একটা গার্মেন্টসে চাকুরি নেয়। একা হয়ে যায় ছালেহা।

আতুরি বেগমের কাজের ভেতর ভেতর আতঙ্কের ছায়া ঘুরপাক খায়। কাজের গতি কমে যায়। সারাক্ষণ ছালেহার ভাবনা। শহরের বস্তি জীবন আত্মস্থ হতে দেরি হয়নি। বস্তীর ছেলেদের চোখ টিপ, চোরা ইশারা এখন প্রকাশ্যে। এমনকি আতুরি বেগমকেও নোংরা সব কথা শুনতে হয়।

বাসার কাজ কমিয়ে দেয় আতুরি বেগম। দুটি ফ্যাটের কাজ কোন মতে শেষ করে ফিরে যায় বিকেলের আগেই। তৃতীয় মাসে বাড়ি ভাড়ার টাকায় টান পড়ে।
ছালেহার বস্তীর নোংরা জীবনের সাথে পরিচিতি বাড়ে। আট বাই দশ ফুট ছাপরার বাইরে যেন তার কোন অধিকার নেই। মনে পড়ে বাড়ির প্রশস্ত উঠোন, এক কোণে পুঁইয়ের মাচা, ঘরের কোল ঘেঁষে পেঁপে গাছের সারি। ইচ্ছে মতো পুকুরের সবুজ জলে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা। মাঠ জুড়ে সাথীদের নিয়ে গোল্লা ছুট, দাড়িয়াবান্ধা, এককা দোক্কা, কত খেলার প্রশস্ত জীবন।

বস্তীর নোংরা ছেলেদের টিপ্লনী দেখলে গা জ্বালা করে। মাথা নিচু করে পথ চলে। কিছুই বলতে মার নিষেধ। অথচ নিজ গাঁয়ে কেউ কিছু বলছে আর হজম করবে! এমন পরিস্থিতি ছিল না কোনদিন।

ছালেহা বুঝতে শিখেছে মাটির অধিকারই বড় অধিকার। শিকড় ছাড়া গাছের মতোই স্পন্দনহীন হয়ে পড়ছে জীবন। এখানে জীবনের চঞ্চলতা বড্ডো উদাসীন।
মাকে রাজি করিয়েই একদিন আনিছা, রাবেয়ার সাথে সাথে গার্মেন্টস এ যোগ দেয়।

সে আরেক বদ্ধ খাঁচার জীবন। তবু জোয়ার ভাটায় এক চিল্তে সুখের ফালি ভেসে উঠে। ছালেহার টাকায় বাসা ভাড়া হয়েও কিছুটা সঞ্চয় বাড়ে। মা মেয়ে স্বপ্ন দেখে রাতের অন্ধকার নামলে।

মা মেয়ের সুখের সংসার। ছালেহা মাকে একদিন ফিস্ফিস্ করে বলে, মা কদিন পর মেশিনে বসুম। অনেক টেকা পামু। তোমারে আর পরের ঘরে কাম করতে দিমু না।

আতুরি বেগমের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। হঠাৎ মনে হয় অনেক দিন পর এক টুক্রা হাসি মা মেয়ে ভাগ করে নিল। আতুরি বেগম ভাবতে থাকে মেয়ের বিয়ের কথা। আবার তওবা তওবা করে দুগাল চাপড়িয়ে নেয়! নিজ মনেই বলে না না। এ বয়সে মেয়ের বিয়ে দিবে না। তা ছাড়া তেমন পোলা কই পামু। আবার ভাবে পোলাগো লগে কাম করে; কোন দিন না কোন অঘটন….। আর ভাবতে চায় না। হাঁপিয়ে ওঠে।

ছালেহা রাত সাড়ে আটটার আগে ফিরতে পারে না। সাত সকালে দুটো রুটি নিয়ে দৌড়ে বের হয়। সে যাত্রায় শত শত মেয়ের কিচিরমিচির মিছিল। মাঝে মধ্যে কাজের ফাঁকে ফ্যাটের জানালার ফাঁক গলিয়ে রাস্তার অবস্থা দেখে।

বড় মায়া হয় মেয়েগুলোর প্রতি। স্কুলে যাওয়ার বয়েসে ওদের সংসারের দায়ভার। প্রতিদিন বার তের ঘণ্টা করে এক নাগাড়ে কাজ করে যায়।
তারপর ছাড়া পেলে পিপড়ার লাইন ধরে নিজ গর্তে প্রত্যাবর্তন। মেয়ের কান্তি দেখে নিজেই হাঁপিয়ে উঠে।

আবারও তিন ঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয় মা। আগের মতো পিছুটান নেই। তারপরও একটু অবসর পেলে ভাবে মেয়েটি কি করছে? কোন ছেলে কি তার পিছু নিয়েছে। নাকি ছালেহা নিজেই কোন প্রলোভনে পড়ে…..

আতুরি বেগম বোঝে চৌদ্দ-পনর বছর বয়সের কি জ্বালা। মেয়েদের শরীরের রেখায় রেখায় যৌবনের ঘনঘটা। বাড়ন্ত যৌবনের অলিগলি লুকাতে গিয়ে বার বার টানাপোড়নে ছেলেদের আকর্ষণ আরো বেড়ে যায়। গতকাল আলেয়ার ঘটনা শুনে আরো চিন্তিত হয়। মেয়েটি গার্মেন্টসের এক দুষ্ট ছেলের নজরে পড়ে যায়। শেষাবধি চাকরি ছেড়ে নিজেকে রক্ষা করে। এমন কিছু ভাবতে গিয়ে দুশ্চিন্তার ভাবনার ভাঁজ তার কপালে ফুটে ওঠে।

আতুরি বেগম এশার নামাজের পর দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে খোদার কাছে ফানা চায়। হে খোদা স্বামীকে হারিয়েছি, আমার মেয়েটাকে তোমার কুদরতি ছায়ার নিচে ঠাঁই দিও।

আতুরি বেগম বাঁশের খোঁপে টাকা জমাতে থাকে। হিসেব করে কত টাকা হলে গ্রামে ফিরে যেতে পারে। স্বামীর ধারকরা টাকার অঙ্কে এলে বেলে হিসাব। স্বামীর কাছে যা শুনেছিল দেবরের কাছে অনেক বেশি। এ জীবনে শোধ দিতে পারবে? নিজেকে বিভ্রান্ত করে। মাঝে মাঝে দিবা স্বপ্ন দেখে। চলার পথে হঠাৎ হঠাৎ কাউকে স্বামীর মতো হয়। একটা সন্দেহের ছায়া দানা বাঁধে। পৃথিবীতে এমনতো বহু ঘটনা রয়েছে। দশ বিশ বছর পর নিখোঁজ ব্যক্তি পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। প্রতিদিন নামাজ বাদে খোদাতালার কাছে দু’হাত তুলে লম্বা মোনাজাত দেয়। খোদা তোমার কুদরততো অসীম। তুমি সবই পার। আমার মানুষটাকে ফিরিয়ে দাও। আমি তো দেখি নাই, বুঝতেও চাই না, এমনও তো হতে পারে মানুষটা মরে নাই হাসপাতালে, অথবা মৃত মানুষটি অন্য কেউ।

ছালেহা ঘুমিয়ে আছে। পাশের ঘরে বাতির আলো বেড়ার ছিদ্র দিয়ে এ ঘরে উকি মেরেছে। সে আলোর ফোটা ছালেহার কপালে বিছিয়ে আছে। আতুরি বেগমের ইচ্ছে করছে হাতের তসবিহ্ রেখে মেয়েটার কপালে একটা চুমু খায়। গ্রামের কোণে একটা ঝোপ ঝাড় ঘেরা বসতবাড়ি, নাম হাজি বাড়ি। এক বাড়িতে অনেক ঘর। ওর দাদার দাদা সেকেলে পায়ে হেঁটে মক্কা শরীফ গিয়েছিলেন, হজ্ব করেছেন। এমনকি হেঁটে ফিরেও এসেছেন। খুব নাম করা সে বাড়ি। সারা বাড়ি জুড়ে পাঁচটা বড় পুকুর। হাজার নারকেল সুপাির গাছ। পুকুর পাড়ে আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেলের সারি। ঘরের ভিটিতে কাত হয়ে আছে পেঁপে, পেয়ারা, জামরুল গাছ। সবটাতো তাদের নিজের নয়। তবু মনে হয় আপনত্বের একটা সুতীব্র আকর্ষণ। কলাপাতার দোলনিতে সবুজ জীবনের আহ্বান। খালিপায়ে ছুটে চলার আনন্দ। পায়ের তলায় এঁটে থাকা মাটি, সবটাই যেন আপন। ঝিরঝির পাতার দোলার সাথে বুক ভরে নিশ্বাস নেয়ার তৃপ্তি। জীবনের চঞ্চলতা উষ্ণতা সবই থেমে আছে। এক সময় মনে হয় আতুরি বেগমের ফিরে যায় গ্রামে। একটা বিষাক্ত বাতাস অভিমানের ভাবনা ফিরিয়ে দেয়।
সকালে উঠেই পরের বাড়িতে ঝি গিরি। মেয়ে চলে যায় সারি সারি মনুষ্য সন্তানের লাইনের একাংশ হয়ে।

মাসের দশ তারিখে মুজুরি নিয়ে খুশী মনে ফিরে আসে ছালেহা। হাতের ঠোঙ্গা থেকে বের করে এক জোড়া নূপুর। আতুরি বেগম আৎকে ওঠে। কিছু বলার আগেই ছালেহা মার মুখ চেপে ধরে।

মা মা কিছু কইবানা, এক জোড়া নূপুর। আমার বান্ধবী আলেয়া কিনলো, লগে আমিও। দাম বেশী না। শখের জিনিস। না-না পরুম না। খালি একদিন। যে দিন মেশিনে প্রথম বার বসুম। জান মা, সুপার ভাইজার কইলো আগামি মাসেই আমারে মেশিন দিব। তুমি খুশী হও নাই মা?

মার মুখ ছেড়ে দেয় ছালেহা। আতুরি বেগম জোর করে হাসির রেখা টেনে নেয় গালে, সাথে দুশ্চিন্তা। মেয়ে লায়েক হয়েছে। বিপদের বয়স এখন। জীবনের পিছিল পথে একবার আছাড় খেলেই সব কিছু শেষ হয়ে যাবে। না জানি কিসের মধ্যে কি হয়ে যায়। আল্লা মাবুদ রক্ষা করো।

শনিবার ভোরে উঠে নিজেকে সাজিয়ে নেয় ছালেহা। মাকে রাতেই জানিয়েছে কাল প্রথমবারের মতো মেশিনে বসবে। বেতন বাড়বে হাজার টাকা। মা আড়চোখে ওর সাজগোজ দেখে। একটা ভয়ের শীতল রেখা আতুরি বেগমের শিরদাড়া বেয়ে নেমে যায়। পায়ে আলতা মেখে নূপুর পায়ে মার দিকে তাকায় ছালেহা।
কেমন লাগতাছে মা, কিছুই যে কওনা যে?

আতুরি বেগমের চোখের পানি বাঁধ মানে না। মেয়ের রূপ দেখে পলক সরিয়ে নেয়। শেষে না নিজের নজর লাগে। ঝট্ করে একটু কাজল তুলে মেয়ের বাম কপালে লাগিয়ে দেয়।

কারো না নজর লাগে! কথাটা মনে কষে রাখে, বলতে পারেনি।

দুপুরের মধ্যেই দেশব্যাপী খবর হয়ে যায়। এম, আর গার্মেন্টস-এর দশতলা বিল্ডিং দেবে গেছে। হাজার হাজার শ্রমিকের কবর হয়েছে।
দুই নম্বর ফ্যাটে বাসন মাজার কাজটা তখনো কাজটা শেষ হয়নি। বাড়ির গৃহিনী টিভি অন করে হায় আফছোস্ করতে থাকে। টেলিভিশনের সারাক্ষণের সংবাদ। দৌড়ে যায় আতুরি বেগম ড্রইং রুমে। টিভিতে দেখে আর শোনে ধ্বংসের কাহিনী। আতুরি বেগম মনে করতে পারে না মেয়ের গার্মেন্টস এর নাম। আল্লা মাবুদ রক্ষা করো। আল্লা মাবুদ রক্ষা করো।

সাভারে এম আর গার্মেন্টস, হ্যাঁ মনে পড়েছে। দশতলা দালানের আটতলাই মাটির নীচে। কিছু কিছু গার্মেন্টস কর্মীকে উদ্ধার করছে মানুষ। আতুরি বেগম আর্তনাদ করে হুঁশ হারিয়ে ফেলে। বাড়ির গিন্নি তার চোখে মুখে পানি ছিটা দেয়। আতুরি বেগম ছুটে যায় বড় রাস্তায়। কোথায় কিভাবে যেতে হবে জানে না।
হাজার মানুষের ভীড়। মৃতদেহ বের করছে দমকল বাহিনী। সাধারণ মানুষের কর্মতৎপরতা। জীবন্ত মানুষের ভীড়ে খুঁজে ফিরে আতুরি বেগম। না ছালেহাকে খুঁজে পায় না। চতুর্দিকে স্বজনের আহাজারি। টেলিভিশনে হাজার মৃতদেহ উদ্ধারের খবর ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। চারদিনের মাথায় তিন হাজার জীবন্ত গার্মেন্টস কর্মী উদ্ধার।

আতুরি বেগম স্থানীয় স্কুল ঘরের বারান্দায় অপেক্ষা করে মেয়ের জন্য। স্বামীর কথা খুব মনে পড়ে। নিজকে মনে হয় বড় একা। আজ যদি পাশে থাকতো! মন চিৎকার করে উঠে আমার ছালেহাকে আমি চাই। তোমরা আমার ছালেহাকে এনে দাও, এনে দাও আমার সন্তান। চারদিনে তার খাওয়া-নাওয়া ঘরে ফেরা বন্ধ। জীবন যেন বিভিষিকা হয়ে থেমে আছে এ চত্বরে। গার্মেন্টস মালিকদের লোভের লেলিহান শিখায় তার মতো হাজারো মায়ের জীবন দাউ দাউ করে জ্বলছে। কে একজন চিৎকার করে বলছে, মরছিতো চিরদিন আমরা। মরছে কোন টাকাওলা রক্ত চোষার দল?
আমাগো রক্তের দামে তাগো গাড়ি চলে, বাড়ি হয়, আর আমরা জিন্দাও লাশ, মরলে পচা লাশ।

মানুষটার দুই ছেলের লাশ সামনে হোগলার বিছানায়। কান্না তার থেমে গেছে। এবার প্রতিবাদের ভাষা। কোথায় নিবে এ লাশ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কি করবে এ লাশ দিয়ে তাও জানে না।

তন্দ্র্রাচ্ছন্ন আতুরি বেগম। স্কুলের দেয়ালে ঠেশ্ দিয়ে বসে আছে। একটু পর পর লাশ জমা হচ্ছে স্কুলের মাঠে। মানুষ পচা গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। হঠাৎ তার কানে ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দ বাজে। আতুরি বেগমের কান খাড়া হয়। ছুটে যায় সদ্য তোলা একটা মেয়ের লাশের দিকে। উদ্ধারকর্মীরা লাশটা চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়। আতুরি বেগম দেখে নূপুর পরা পা দুটি লাল। আলতা না রক্তের রং বুঝতে পারে না। একটা গলিত দেহ। মাথার কাপড়টা সরিয়ে নেয়। চেনার উপায় নেই। বাম কপালে কাল টিপটা ধূলায় আচ্ছন্ন।

আতুরি বেগম চিৎকার করে ওঠে, এ লাশ আমার। এ লাশ আমার।






মন্তব্য চালু নেই