মেইন ম্যেনু

এক নারীর আঁচলে বাঁধা মহিলা দল

সংগঠনের এক নেত্রীর বৃত্তে বন্দী হয়ে পড়েছে বিএনপির অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী মহিলা দল। সংগঠনের নেতাকর্মীরা বলছেন, এক এগারোতে বিএনপির চরম দুঃসময়ে যখন দলের কোনো নেতাকর্মীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, তখন যে মহিলা দলের সাহসী ভূমিকায় বিএনপিকে জিইয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল, সে সংগঠনে এখন আর কোনো ঐক্য নেই।

রাজপথে সবাইকে সাহস জোগানো এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেরাই এখন দ্বন্দ্ব, কলহ আর এক নেত্রীর স্বেচ্ছাচারিতায় স্তিমিত হয়ে পড়েছে। তাই আন্দোলন কর্মসূচিতেও আর তেমন জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, সাধারণত প্রতিদিন বিএনপি চেয়ারপারসন যেখানে যান সেখানেই থাকেন শিরিন সুলতানা। চেয়ারপারসনের একা হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয় তাই সঙ্গ দেন তিনি। এটা ভালো কিন্তু এজন্য অনেক রাত পর্যন্ত চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থান করতে হবে তাকে? আর একারণে কোনদিনই তাকে দুপুর ১২টার আগে পাওয়া যায় না। নয়পল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে ব্রিফিং এ উপস্থিত থাকলেও একই ভবনে মহিলা দলের কার্যালয়ে অনিয়মিত তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংঠনের একসময়ের ত্যাগী একাধীক নেত্রী ও বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতা বলেন, শিরিন সুলতানার স্বেচ্ছাচারিতায় বর্তমানে আমাদের মহিলা দলে চলছে সুলতানী আমলের স্বৈরতন্ত্র। শাঁখের করাতের মধ্যে আছেন সভাপতি। মহিলা দল মানেই একজন। এখানে কারও কোনো মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে একজনের সিদ্ধান্তেই চলছে সংগঠনটি। ফলে একসময়ের ত্যাগীদের বাদ দিয়ে গার্মেন্টস কর্মী দিয়ে অনেক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ সংগঠন দিয়ে সেলিমা রহমানের মতো মেধাবী ও শিক্ষিত নেতৃত্ব এখন আর তৈরি হয় না।

সভাপতিকে না জানিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক কমিটি দিয়ে দেন তিনি। শিরিন সুলতানা সবসময় দলের চেয়ারপারসনের কাছাকাছি থাকেন। সেজন্যই তিনি এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধাচরণ করলেই কপালে জোটে সবার সম্মুখে অপদস্থ হওয়া অথবা বহিষ্কার।
সাধারণ সম্পাদিকা সমর্থিত এক নেত্রী বলেন, ‘দলের ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেত্রী হিসেবে শিরিন সুলতানার সুনাম আছে। কিন্তু তার একক কর্তৃত্ব করার মানসিকতার জন্য তিনি এখন সকলের বিরাগভাজন হয়েছেন।’

এদিকে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত অফিসে মহিলা দলের কোনো নেতাকর্মীদের পদচারণা কিংবা সেরকম ভূমিকা রাখতে দেখা যায়না। কোনো প্রয়োজন হলে মোবাইলের মাধ্যমেই কাজ সারছেন নেতারা। এ দলের অনেক মহিলা সাংসদ (সংরক্ষিত) রয়েছে যারা বছরে একবারও নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন না।’

সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদিকা ও সাবেক সংসদ সদস্য বলেন, ‘বর্তমান মহিলা দল কার্যত একটি অথর্ব দল। আমাদের মহিলা দল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে কেন? আমরা করবো বিক্ষাভ সমাবেশ আর মিছিলের মতো কর্মসূচি। আওয়ামী লীগের যুব মহিলা লীগ আন্দোলনে, হরতালে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করলেও আমাদেরটা ভিন্ন। তারা আন্দোলনে থাকে না, থাকে চেয়ারপারসনের মঞ্চে।’

সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘আমাকে দপ্তর সম্পাদকের পদ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা (পাপিয়া, হেলেন, হিরা) প্রথম থেকেই কমিটিটাই মানি নাই। সেজন্য যাইনি, কোনো কাজও করিনি। আমাকে বহিষ্কার করে না কেন? আমি ম্যাডামকে বলেছি, আমরা যাবো না। কোথাও আমি এই পদ ব্যবহার করিনি।’

তিনি বলেন, ‘মহিলা দলে শিক্ষিত মানুষরা বিতাড়িত হয়েছে বা টিকতে না পেরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কারণ এখানে রাজনীতি করার কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ নাই। এর জন্য শিরিন সুলতানা দায়ী। মহিলা দলে শিরিন সুলতানের স্বৈরাচারি মনোভাব।’ মহিলা দলে টাকাপয়সার বিনিময়ে কমিটি কেনাবেচা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সাবেকে এমপি ও ছাত্র নেত্রীদের আগামী কমিটিতে আনলে মহিলা দল সংগঠিত হবে বলেও মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান বাংলামেইলকে বলেন, ‘মহিলা দলে সভাপতির কোনো ভূমিকা নেই। তিনি একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। তার ভালো মানুষীর সুযোগ নিয়ে সাধারণ সম্পাদিকা শিরিন সুলতানা যা খুশি তাই করছেন।’

তিনি বলেন, ‘মহিলা দলের শিরিন সুলতানাই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। সকল সিদ্ধান্ত তিনি একাই নিয়ে থাকেন। তার একক কর্তৃত্ব চলে মহিলা দলে। সেখানে অন্য কেউ কিছু বলতে পারে। এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার।’

তিনি আরো বলেন, ‘মহিলা দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা দরকার। এ ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং সাংগঠনিক কাউকে নেতৃত্বে আনা উচিৎ।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মি আকতার বলেন, ‘মহিলা দলে এমন কিছু অনিয়ম হয়েছে যা আমাদের পছন্দ হয়নি। সেজন্য আমরা প্রথম থেকেই মহিলাদলের কার্যক্রমে অংশগ্রহন করিনা। কিন্তু আমরা বিএনপির সকল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করি। কিন্তু বিএনপির মহাসচিব বা মহিলা দলের সভাপতি আমদেরকে অ্যাকটিভ করার জন্য প্রশ্ন করতে পারতেন করেননি।’

তিনি বলেন, ‘মহিলা দলে সভাপতির কোনো কথা ধোপে টিকে না এটা সবাই জানে। এক ব্যক্তির আঙ্গুলি হেলনে চলছে মহিলা দল। তিনি যাকে পছন্দ করেন তাকে কমিটিতে পদ দেয়া হচ্ছে প্রমোশন দেয়া হচ্ছে। তিনি যাকে অপছন্দ করেন না সেজন্য যোগ্য মেধাবিই হোক না কেন সে নিগৃহিত হচ্ছে।’ কমিটিতে অবিলম্বে যাছাই বাছাই করে যোগ্যদের উপযুক্ত পদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করা উচিৎ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কোনো কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরি না করে সিলেকশনের মাধ্যমেই চলছে এ অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠন প্রক্রিয়া। কমিটি গঠন নিয়েও দলে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সভাপতি সুলতানা আহমেদ বলেন, অতীতের চেয়ে মহিলা দল এখন অনেক শক্তিশালী। ঢাকা মহানগরের ওয়ার্ড কমিটি গঠন শেষ। থানা কমিটি গঠন চলছে। ঢাকা মহানগর কমিটিগুলো স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

দপ্তর সম্পাদক ওয়াহিদা আক্তার মুক্তা বলেন, ‘ঢাকা মহানগরের চেয়ে জেলায় মহিলা দল সাংগঠনিকভাবে বেশি শক্তিশালি। জেলা কমিটি গঠন প্রায় শেষ পর্যায়ে। জেলা ও ঢাকা মহানগরের গঠনের পরই কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হবে।’

মহিলা দলে শিরিন সুলতানার এক কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ কথা ঠিক নয়। কিছু কিছু বিষয় নিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে মতের পার্থক্য হতে পারে, তবে সব কিছুই সভাপতির সাথে পরামর্শ করে করা হয়।’

বেশির ভাগ কমিটি সিলেকশনের মাধ্যমে দেয়া হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেখানে প্রার্থী বেশি সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করা হচ্ছে। সভাপতির স্বাক্ষর ছাড়া কোনো কমিটি অনুমোদন হয় না তাই সভাপতিকে না জানিয়ে কমিটি দেয়ার বিষয়টি মিথ্যা।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কিছু বলতে অস্বীকার করেন মহিলা দলের সভাপতি নূরে আরা সাফা। তিনি বলেন, ‘আমি কিছু বলবো না। আমি বিএনপিতে ছিলাম আছি থাকবো।’

ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘খুব শীঘ্রই মহিলাদলের সার্বিক বিষয় নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে কথা বলবো। তার কাছেই যা বলার বলবো।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে দলের সাধারন সম্পাদিকা শিরিন সুলতানা বলেন, ‘আমাদের মহিলা দলে কোন দ্বন্দ্ব কোন্দল সমস্যা নাই। দেশের অন্যান্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের মহিলা গঠনের চেয়ে আমাদের সংগঠন অনেক বেশি শক্তিশালী। আমরা সাধ্যমতো দলের সকল কর্মসূচি পালন করছি।’

নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মার্চ-এপ্রিলে মহিলা দলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন জেলা কমিটিগুলো গঠন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকা মহানগেরর ৩৩টি থানা কমিটির মধ্যে অধিকাংশ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সব কাজ শেষ হয়ে আমরা কাউন্সিল করতে পারবো। সব কাজ শেষ হলে চেয়ারপারসন যদি মনে করে নতুন কমিটি গঠন করা দরকার, করবেন। নতুন কমিটিতে আমাকে পদ দিলেও খুশি না দিলেও খুশি।’

মহিলা দলে একক কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এসব মিথ্যা কথা। সভাপতি আমার মায়ের মতো। তার সাথে আমার কোনো মনোমালিন্য নাই। দুজনে আলোচনা করেই সাংগঠনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেই, কমিটি দেই। তার স্বাক্ষর ছাড়াতো আর কমিটি দেয়া সম্ভব নয়। এখন কেউ যদি এসব বলে তাতে আমার কিছু আসে যায় না।’

তিনি বলেন, ‘কয়েকজন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আছে যারা পদ নিয়ে বসে আছে অথচ কোন কাজ করে না। তারা চার বছর ধরে আসে না অথচ তারা মহিলা দল সম্পর্কে ও আমার সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলে, বড় বড় কথা বলে। তারা এ কমিটি না মানলে পদত্যাগ করলো না কেন। এ সব কথা কোন ভিত্তি নেই। তাদেরকে মহিলা দলের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় করার জন্য সভাপতি একাধিকবার পদক্ষেপ নিয়ে বিফল হয়েছেন। কিন্তু তারা তখন সংসদ সদস্য হওয়ায় কোনো তোয়াক্কা করেনি। এখন এমপি না থাকায় মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’

ম্যাডামের কাছাকাছি থাকায় এর প্রভাবি বিস্তার সম্পর্কে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার কাছে বিশ্বস্ততার পরীক্ষায় বা কাজের ক্ষেত্রে কারো কাছে ধার নিতে হবে। রাজনীতি, দক্ষতা সততার দিক দিয়ে আমার মতো মহিলা পাওয়া খুব কঠিন। খালেদা জিয়া কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ গেলে সাত দিনও থাকতে পারে না। কিন্তু আমি তো অনেক দিন ধরেই আছি। খালেদা জিয়া যাকে তাকে কাছে রাখে না। যাকে বিশ্বস্ত মনে করেন তাকেই রাখেন। এখন খালেদা জিয়ার দুঃসময় এখন তার সাথে আছি। কিন্তু খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হবেন তখনতো আর তার সাথে থাকতে পারবো না। আমি যদি দল করে সংসার করে সব সামাল দিয়ে ম্যাডামের সাথে থাকতে পারি তাতে দোষ কোথায়?’

তিনি বলেন, যারা কাজ করেনা তাদের বিষয়ে ম্যাডামের সাথে কথা হয়েছে, ম্যাডাম বলেছেন, যারা কাজ করে না, না করুক। তোমার কাজ তুমি চালিয়ে যাও। কাজ না করায় আগামিতে কমিটি হলে তখন তাদের পদ পেতে কষ্ট হবে। দলের কিছু নামধারী নেত্রী অপপ্রচার চালালেও তারা সংগঠনের কেউ নয় বলেও তিনি দাবি করেন।

মহিলা দলের এক ব্যক্তি কর্তৃত্বে অতিষ্ট হয়ে অনেকেই যুব মহিলাদল গঠনের তোড়জোর করছেন বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালে পহেলা সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠন হওয়ার সাত দিন পর ৯ সেপ্টেম্বর ড. আমেনা রহমানকে সভাপতি ও সারোয়ারী রহমানকে সাধারণ সমপাদক করে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালের কমিটি দিয়ে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়েছে এ সংগঠন। প্রায় ১১বছর পর ২২ মার্চ ২০১০ সালে বর্তমান কমিটি গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত গঠনতন্ত্র করা হয়। কমিটি গঠন নিয়েও দলে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। গঠনতন্ত্রে তিন বছর পর পর দলের কাউন্সিল করার কথা থাকলেও সিলেকশনের মাধ্যমেই চলছে এ অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠন প্রক্রিয়া।

জন্মলগ্ন থেকে ১৯৭৯ সালে একবার কাউন্সিল হয়েছিল। বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৩৫১ জন সদস্য রয়েছে। সূত্র : বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই