মেইন ম্যেনু

আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ, এগিয়ে নারীরা!

ঢাকা মহানগরীতে বিয়ে বিচ্ছেদ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের (উত্তর-দক্ষিণ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে প্রায় ৩১ হাজার। যার মধ্যে পুরুষের তুলনায় স্বামী তালাকে এগিয়ে রয়েছেন স্ত্রীরা।

অর্থাৎ পুরুষের চেয়ে নারীরা এক্ষেত্রে ঢের এগিয়ে গেছেন, যা কিছুদিন আগেও ছিল সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কল্পনাতীত। তালাক দেয়ার দিক থেকে নারীরা এগিয়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়, পুরুষত্বহীনতা, মতের অমিল এবং তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার ও এর মাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অবাধ যোগাযোগ অন্যতম।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, মূলত বিবাহবিচ্ছেদের দুই কারণ। প্রথমত, সামাজিক কারণ, অন্যটি অর্থনৈতিক। এ ছাড়া দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য, শারীরিক চাহিদা না মেটানো, বয়সের পার্থক্য, মানুষের মধ্যে শূন্যতা সৃষ্টি ও আধুনিক সংস্কৃতির কারণে সংসার বেশি ভাঙছে। এর বাইরেও নানা কারণে বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটতে পারে।

তিনি আরো বলেন, সমাজে তথ্য-প্রযুক্তির প্রভাবে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপিসহ নানা প্রযুক্তির বিকৃত ব্যবহার, পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, বিদেশি অপসংস্কৃতির প্রভাব, নিজেদের মাঝে আত্মতুষ্টি না থাকা, একে অপরের মাঝে বোঝাপড়ার অভাব বা ধৈর্যচ্যুতি, পারিবারিক শিক্ষা ও সচেতনতা না থাকাসহ নানা কারণে পরকীয়া ও বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে।

দুই সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় বছরে বিবাহবিচ্ছেদের নোটিস পড়েছে ৩৬ হাজার ৩৭১টি। এর মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৩০ হাজার ৮৫৫টি। স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে তালাকের নোটিস পড়েছে ২৪ হাজার ৮০৩ এবং স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাকের নোটিস ১২ হাজার ১৮টি। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৪টি, মাসে ৪২৯টি এবং বছরে পাঁচ হাজার ১৪৩টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।

উত্তর সিটির হিসাব মতে, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সংস্থাটির পাঁচটি অঞ্চলে মোট ২০ হাজার ৫৮৪টি তালাকের নোটিস পড়েছে। এর মধ্যে স্বামীর পক্ষ থেকে সাত হাজার ১৯ এবং স্ত্রীর পক্ষ থেকে ১৩ হাজার ৪৬৫টি। নোটিস প্রত্যাহার হয়েছে ৪৬৫টি এবং কার্যকর হয়েছে ১৬ হাজার ৬২১টি। তিন হাজার ৫১৮ নোটিস চলমান।

অন্যদিকে, দক্ষিণ সিটির পাঁচটি অঞ্চলে বিচ্ছেদের নোটিস পড়েছে ১৫ হাজার ৭৮৭টি। এর মধ্যে স্বামীর পক্ষ থেকে চার হাজার ৯৯৯টি, স্ত্রীর পক্ষ থেকে ১০ হাজার ৮০৩টি। নোটিস প্রত্যাহার হয়েছে ৩৪৮টি এবং কার্যকর হয়েছে ১৪ হাজার ২৩৪টি।

বিবাহ ও বিচ্ছেদ নিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন গবেষণা করছে ১৯৯৫ সাল থেকে। করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বিভক্ত হওয়ার পরও তা চালু আছে। প্রতিবছর জুনে তারা গবেষণা প্রতিবেদন জমা দেয়। তাদের গবেষণা অনুযায়ী, যেসব আবেদন ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে তার মধ্যে ৮৭ শতাংশ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে পরকীয়ার জের ধরে।

ঢাকা সিটি করপোরেশন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সালে ঢাকা শহরে মোট ডিভোর্স নোটিসের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৭৫৩টি, ২০০১ সালে দুই হাজার ৯১৬টি, যার মধ্যে ডিভোর্সের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৫৪০টি, ২০০২ সালে নোটিসের সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৭৩টি, এর মধ্যে তালাক হয়েছে দুই হাজার ৬১৫টি, ২০০৩ সালে নোটিস এসেছে তিন হাজার ২০২টি, এবং এর মধ্যে তালাক হয়েছে দুই হাজার ৯৬১টি, ২০০৪ সালে তালাকের নোটিস এসেছিল তিন হাজার ৩৩৮টি, এবং আপস হয়েছে ৩৩৮টি।

ডিএসসিসির সালিশ পরিষদের কর্মকর্তারা জানান, বিবাহবিচ্ছেদের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা যেভাবে বাড়ছে তাতে তারাও উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, প্রতিবছর যত আবেদন সালিশি বোর্ডের কাছে কিংবা কাজি অফিসগুলোতে জমা পড়ছে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। সামাজিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই সালিশি বোর্ড কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আসেন না। অনেক সময় পারিবারিক এবং সামাজিকভাবেই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে। এর সুরাহা হওয়ার প্রয়োজন বলেও তারা মনে করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বামী বা স্বামী পক্ষের যৌতুক দাবি, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, মাদকাসক্তি, পরকীয়া, দুজনের জীবনযাপনে অমিল, সন্দেহপ্রবণতা, স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ না পাওয়া, স্ত্রীর অবাধ্য হওয়া, ফেসবুক ও টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাধিক সম্পর্কে জড়ানো এবং ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী, জীবনযাপন না করায় তালাকের ঘটনা ঘটছে।

এ বিষয়ে অঞ্চল-১ এর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানাউল হক বলেন, বিবাহবিচ্ছেদের নোটিস পাওয়ার পর দুই পক্ষকেই আপসের জন্য ডাকা হয়। তাদের কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে আপসের চেষ্টা করা হয়। তবে একটা বিষয় হলো সমস্যা সমাধানের জন্য দুই পক্ষ ডাকা হলেও বেশির ভাগ দম্পতিই তাদের ডাকে সাড়া দেয় না। নোটিসের সময় থাকে ৯০ দিন। নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলে এমনিই তালাক কার্যকর হয়ে যায়।

সংসার ভাঙতে নারীরা এগিয়ে থাকার কারণ হিসেবে এই কর্মকর্তা বলেন, নারীরা এখন অর্থের দিক থেকে খুব স্বাধীন। যেকোনো সিদ্ধান্ত তারা নিজেই নিতে পারে। এ ছাড়া তথ্য প্রযুক্তির কারণে এসব ঘটনা বেশি ঘটছে।

বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সামাজিক মূল্যবোধ জাগানো এবং তথ্য-প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। বন্ধ করতে হবে পর্ন সাইটগুলো। অপসংস্কৃতি রোধে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও পরিবারের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। কমপক্ষে দিনে-রাতে একবার পরিবারের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে দূরত্ব কমানোরও তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।






মন্তব্য চালু নেই