মেইন ম্যেনু

অসচেতনতায় বাড়ছে চরের জনসংখ্যা

সরকারি নিয়ম অনুসারে পরিবার কল্যাণ সহকারীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সর্ম্পকে জনগনকে সচেতন করার কথা। কিন্তু কুড়িগ্রাম জেলার রাজীবপুর ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে প্রায় অর্ধশত বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা পাওয়া যায় না।
ওইসব চরে না গিয়ে ঘরে বসে থেকে প্রতিবেদন দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ আছে। ফলে অসচতেনতা আর দরিদ্র দম্পতিরা পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সর্ম্পকে সম্মুখ কোনো ধারণা পায় না। এ পদ্ধতি বিষযে অজানার কারণে চরাঞ্চলের ঘরে ঘরে জন সংখ্যা বাড়ছে। এর সঙ্গে রয়েছে বহু বিয়ে ও বাল্য বিয়ের প্রভাব। ব্রহ্মপুত্রের বুকে রৌমারী, রাজীবপুর ও চিলমারী উপজেলার বেশ কয়েকটি চরাঞ্চল ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।
সরেজমিনে রাজীবপুরের নাওশালা চর ঘুরে দেখা গেছে, ধনী পরিবারের তুলনায় দরিদ্র পরিবারে সন্তান জন্মদানের হার অনেক বেশি। ওই চরর ফজর আলী (৩২) একজন দিনমজুর। দু’হাতের ওপর জীবিকা করে চলছে ৫ সন্তানসহ ৭ সদস্যের সংসার। ফজর আলীর স্ত্রী ছালেকা বেগম। বিয়ের বছরেই তাদের ঘরে প্রথম মেয়ে সন্তান জন্ম দেয়। এভাবে তাদের ঘরে ৫ সন্তান আসে। বড় মেয়ে আল্পনা খাতুন ৫ম শ্রেণীতে। তার ছোট আমিনা খাতুন ৩য় শ্রেণীতে পড়ে। আরো ৩ জন এখনও স্কুলে যায় না।
জন্ম নিয়ন্ত্রণ সর্ম্পকে জানতে চাইলে ছালেকা বেগম বলেন, ‘ওটা আবার কী, বুঝি না। আল্লাহয় দেয়। এহানে তো মাইনসের হাত নাই।’
একই চরের রশিদা বেগম (২৫)। স্বামী দেলভার হোসেন একজন দিনমজুর। বিয়ে হয়েছে ৯ বছর আগে। একটি ছেলে সন্তানের জন্য এক এক করে ৪ মেয়ে সন্তনের মা হয়েছেন। এখনও ছেলের মুখ দেখা হয়নি তার। কিন্তু স্বামী ছেলে সন্তানের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠছে। তাই আবারও সন্তান পেটে নিছেন রশিদা বেগম।
জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘হেইডা আবার কি? আমরা অতশত বুঝি না।’
এ সময় জমিরন নেছা (৫০) নামে গর্ভবতীকে স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করতে মাথার ঘোমটা যতদূর যায় টেনে অন্য জনকে নাম বলতে বলেন। কারণ স্বামীর নাম তিনি বলতে চান না। কথা বলে জানা গেল তার ছেলেমেয়ে ৮ জন। স্বামী ওয়াহেদ মোল্লা (৬৫) চরের একজন মাতাব্বর।
রৌমারীর পালের চরের খায়রুন খাতুন। তার স্বামী মজিবুর রহমান দিনমজুর। বিয়ে হয়েছে ৬ বছর হয়। এরই মধ্যে তাদের ঘরে ৩ সন্তানের জন্ম নিয়েছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করলে খায়রুন খাতুন বলেন, ‘আল্লাহ দিলে আমরা কী করমু। আল্লায় দেয়, হেই খাওন দিবো।’
তাদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কোনো কর্মীই ওই চরে যায় না। কর্মীদের চেনেও না চরের কোনো মানুষ। ফলে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি থেকে বঞ্চিত ওই চরের মানুষ।
চরের কোকিল মণ্ডল, শরবর আলী, নজরুল ইসলাম, আশরাফ আলী, ইমান দেওয়ানী জানান, পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের এই চরে কোনো দিনও দেখি নাই।
কোদালকাটি চরের দিনমজুর আইয়ুব আলী ও তার স্ত্রী কোহিনুর বেগমের বিয়ে হয়েছে ৮ বছর হলো। এরই মধ্যে তাদের কোলজুড়ে ৫ সন্তানের জন্ম হয়েছে। কোহিনুর বেগম বলেন, ‘হুনছিলাম কী খাইলে বলে পোলাপন অয় না। কিন্তু ওগুলান পামু কার কাছে?’
তাদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেল পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কোনো কর্মী তাদের বাড়িতে কোনো দিনও যায়নি। ফলে তার জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সর্ম্পকে কোনো অবগত নয়। কোহিনুর বেগমের মতো বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে অসংখ্য দম্পতি রয়েছে যারা জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বিষয়ে জানেন না। ফলে চরগুলোতে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে।
চরের নাম কীর্তনতারি। চরের বয়স ১৮ বছর। ব্রহ্মপুত্রের পলি ও বালু পড়ে চরটি জেগে ওঠে। এখানে দেড়শ পরিবার বসবাস করে। চরের মুরব্বী হাশেম আলী। তার ঘরে ১০ ছেলে মেয়ে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে তো এ গুলান ছিল না। এহন হইছে। তাছাড়া ওগুলান খাওয়া তো ধর্মে নাই।’ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করা ওই সব চরের মানুষ এখনও পরিবার পরিকল্পনা সর্ম্পকে তেমন কিছুই জানে না। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকা, দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন বলে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের লোকজনও খুব একটা যায় না। ফলে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যাচ্ছে চরের মানুষ। দরিদ্রতা, কুসংস্কার, ধর্মীয় অনুশাসন, অসচেতনতার কারণে চর জনপদে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে।
ব্রহ্মপুত্র নদে বড়বেড়, কীর্তনতারি, শিকারপুর, সন্নাসী কান্দি, চড়াই হাটি, করইবইশাল, নালিতা খাতা, পালের চরগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চরগুলোতে পরিবার পরিকল্পনা কর্মীরা তাদের দায়িত্ব পালন করেন না। মাসে একবারও চরে যান না স্বাস্থ্য কর্মীরা। অভিযোগ আছে কর্মীরা ঘরে বসে প্রতিবেদন তৈরি করে থাকেন।

রাজীবপুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বিলকিস বেগম জানান, দারিদ্র বিমোচনের পাশাপাশি নতুন দম্পতি, দরিদ্র ও নিরক্ষর নারীদের চিহ্নিত করে তাদের কাছে পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তা না হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কখনও সম্ভব হবে না।

এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম জেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শামসুদ্দোহা বলেন, ‘এখন আর আমাদের মাঠ পর্যায়ে কর্মী শূন্যতা নেই। ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মী রয়েছে। চরাঞ্চলের কর্মীরা যায় না, কাজ করে না এটা মনে হয় সত্য নয়। তারপরও আমি খোঁজ নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’






মন্তব্য চালু নেই