মোবাইলের ম্যাসেজে সোনার বার টয়লেটে

ঢাকার হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সোনা চোরাকারবারী চক্র শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এ চক্রে জড়িয়ে পড়েছে সিভিল অ্যাভিয়েশনের কর্মী, পরিচ্ছন্ন কর্মী (ক্লিনার), বিমানের কর্মীসহ বিমানবন্দরে দায়িত্বরত অনেকে। পাচারকারী চক্রের সংকেত অনুয়ায়ী নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সোনার চালান সংগ্রহ করে আবার আরেক স্থানে রাখে তারা। এভাবে স্থান ও হাতবদল হয়ে সোনার চালানগুলো বিমানবন্দর এলাকা থেকে সরিয়ে নেয় চোরকারবারী চক্র। বিমানবন্দরে দায়িত্বরত চোরাকারবারীদের সহযোগীদের মোবাইল ফোনে ম্যাসেজের মাধ্যমে আসে সোনা সরানোর বার্তা। নির্দেশনা অনুযায়ী চালান স্থানান্তর করে মোটা অংকের কমিশন পায় তারা।
শনিবার হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে প্রায় ১০৬ কেজি সোনার চালান উদ্ধারের পর এমন তথ্য পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ৯০৫টি সোনার বার উদ্ধারের ঘটনায় বাংলাদেশ বিমানের শীততাপ যন্ত্রের কারিগরি সহকারী (এসি ম্যাকানিক) আনিসউদ্দিন ভূইয়াকে আটকের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তার মোবাইল ফোনে মাসুদ নামে এক ব্যক্তি ম্যাসেজ পাঠিয়ে সোনার চালানের ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়। এরপর বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটের টয়লেটে সোনার বারগুলো রাখা হয়।
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি বড় চালান আটক করেছে শুল্ক বিভাগ ও গোয়েন্দারা। কয়েকটি ঘটনায় বিমানকর্মী, সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্মী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। উদ্ধার করা চালানের মধ্যে শনিবারের চালানটি পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম। এ সোনার বাজার মূল্য প্রায় ৪৮ কোটি টাকা। বিমানবন্দরের কর্মী আনিসের তথ্যের ভিত্তিতে চোরাকারকারী চক্রটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে শুল্ক গোয়েন্দারা।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মইনুল খান বলেন, ‘শনিবার সকাল ৯টার দিকে বাংলাদেশ বিমানের বিজি-০৫২ নম্বর ফ্লাইটটি দুবাই থেকে এসে ঢাকায় অবতরণ করে। এরপর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ফ্লাইটটিতে দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালানো হয়। দুপুর ২টার দিকে পেছনের দিকের টয়লেট থেকে কালো কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় সোনার বারগুলো উদ্ধার করা হয়।’ ডিজি মইনুল খান বলেন, ‘চোরাচালানে জড়িত সন্দেহে বাংলাদেশ বিমানের কারিগরী সহকারী আনিস উদ্দিনকে আটক করা হয়েছে। এ বিমানকর্মীর মোবাইল ফোনের কললিস্টে পাচারকারীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে। আনিসকে তার মোবাইল ফোনে মাসুদ নামে এক ব্যক্তি সন্দেহজনক ম্যাসেজ পাঠায়।’ পরে এর সূত্র ধরেই চোরাচালানটি উদ্ধার করা হয় বলে জানান মইনুল খান।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘উদ্ধারকৃত ৯০৫টি সোনার বারের ওজন ১০৫ কেজি ৪০০ গ্রাম। এগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ৪৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।’ তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় ফৌজদারি আইনে একটি মামলা হয়েছে। মাসুদের সংকেত পেয়ে টয়লেটে চালানটি ফেলা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ম্যাসেজে আনিসউদ্দিনকে চালানের ব্যাপারে তথ্য দেয়া হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটির নাগাল পাওয়া যেতে পারে।’
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত এক বছরে বিমানবন্দরে সোনা উদ্ধারের ঘটনা বেড়েছে। বরাবরই সোনার চালান পাচারে বিমানকর্মী, ক্লিনারসহ বিমানবন্দরের অনেকে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বেশিরভাগ ঘটনারই রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। গত বছরের ২৪ জুলাই শাহজালালে ১২৪ কেজি সোনার চালান আটক করা হয়। এটি সম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় চালান। শনিবারের চালানটি দ্বিতীয় বৃহত্তম। এছাড়া গত বছরের ২২ অক্টোবর বিমানের টয়লেট থেকে ৩০ কেজি ওজনের ২৮০টি সোনার বার, ৩০ অক্টোবর টয়লেট থেকেই ১৭ কেজি ওজনের ১৪৭টি বার এবং ২৭ নভেম্বর রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটের টয়লেট থেকে ২০ কেজি ওজনের ১৬০টি বার উদ্ধার করা হয়। গত বছরেরই ১১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটের টয়লেট থেকে ১৬ কেজি ওজনের ১৩৮টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত এক সপ্তাহে শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারটি চালান আটক করেছে শুল্ক বিভাগ ও গোয়েন্দারা। গত শুক্রবার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে মাধ্যমে ২৮টি সোনার বারসহ দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাইটের যাত্রী বাহারকে আটক করে শুল্ক গোয়েন্দারা। গত মঙ্গলবার রাতে এক কেজি সোনাসহ এক তরুণী এবং সোমবার রাতে ২০ কেজি সোনার বারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে তারা।


মন্তব্য চালু নেই