ড. জাফর ইকবাল স্যার এবং ছাত্রলীগের ছোট্ট গল্প

প্রতিটি ছাত্র সংগঠন তাদের দল-মতের নীতি আদর্শ মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করবে, শিক্ষাঙ্গন রাখবে মারামারি হানাহানি মুক্ত, অন্যান্য শিক্ষার্থীকে তাদের শিক্ষাগ্রহণে সহযোগীতা করবে, থাকবে সম্মানিত শিক্ষক মহোদয়ের সাথে সু-সম্পর্ক এমনই আরো কিছু সৎ গুণাবলি নিয়ে প্রতিটি ছাত্র সংগঠন তাদের মতাদর্শ মেনে শিক্ষায় মনোনিবেশ করবে বলেই আমাদের মত সাধারণ মানুষের জানা। তবে এই ধারণা যে সম্পূর্ণ উল্টো যেটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কারণ ছাত্র সংগঠনগুলো (ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রশিবির) যেন শিক্ষাঙ্গন কলুষিত করে সকল প্রকার হামলা, হাঙ্গামা, মারামারি, অত্যাচার, নির্যাতনে ব্যস্ত।

বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ বেপরোয়া থেকে সর্বোচ্চ বেপরোয়ায় দন্ডায়মান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়সহ প্রায় প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন ছাত্রলীগের তান্ডবে থাকে সর্বদা তঠস্থ, শিক্ষা হচ্ছে তাদের দ্বারা কলুষিত। বিপক্ষ দলের সাথে মারামারিতো সর্বদা হরহামেশা ব্যাপার, এটাতো তাদের কাছে অনেকটা সকাল বিকেলের ডাল-ভাত। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকগণও তাদের হামলা, অত্যাচার, নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। আর এরই ধারাবিহকতায় সর্বশেষ শিকার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। ওইদিন হামলার শিকার হয়েছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারও। আর সেদিন হামলার শিকার ড. জাফর ইকবাল ছাত্রলীগের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তবে এর দুদিন পরেই স্যার মহোদয় তার বক্তব্য পাল্টে ছাত্রলীগকে বাচ্চা ছেলে অভিহিত করে তাদের কোন দোষ নেই বলেই মন্তব্য করলেন যাহা ছাত্রলীগের এই সকল হীন কাজকে উৎসাহিত করে এমনটা একবারে ভুল হবে না বললেই চলে। ছাত্রলীগকে উৎসাহিত করা জাফর ইকবাল স্যারের সেই বক্তব্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায়-

গত তিনদিন আগে রবিবার (আগস্ট ৩০) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল “স্বনামধন্য” ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়ে প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে সারাক্ষণ বসে বসে বৃষ্টিস্নাত হয়ে গিয়ে বলেছিলেন, “আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছি। জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ছাত্রলীগ শিক্ষকদের উপর হামলা করেছে। শিক্ষক হিসেবে আমার গলায় দড়ি দিয়ে মরে যাওয়া উচিত। জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, আজ সেই স্লোগানকে অপমান করা হয়েছে।”

এর একদিন পরের কথা- সোমবার (আগস্ট ৩১) মনের কষ্ট, দু:খ, বেদনায়, ক্ষোভে সম্মানিত স্যার ড. জাফর ইকবাল এ ঘটনায় সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন রেখে বললেন, “এ ঘটনায় কার কাছে বিচার চাইব। যাদের কাছে বিচার চাইব তারাইতো এই ঘটনা ঘটিয়েছে।”

এবার ছাত্রলীগের এই ঘটনার জেরে সর্বশেষ শ্রদ্ধেয় স্যার মহোদয় এই ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠনের নেতাদের অনেকটা “শিশু বাচ্চা” বলে অভিহিত করে তাদের কোন দোষ নেই বলে অভিমত প্রকাশ করলেন। গত দু’দিন যে ছাত্রলীগের ব্যাপক সমালোচনায় পঞ্চমুখ সেই স্যার মহোদয়ই নিজ মুথে তার কথা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, “ তারা (ছাত্রলীগ) ‘বাচ্চা ছেলে’ তাদের কোন দোষ নেই, ওদের বহিষ্কার করায় দুঃখ পেলাম।” স্যার আরো বলেন, “ এরাতো আমাদের ছাত্র। এত কমবয়সী ছেলে, এরা কি বুঝে? ওদেরকে আপনি যা-ই বোঝাবেন; তাই বুঝবে। কাজেই আমি যখন দেখলাম যে তিনজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে-আর চারজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে; এখন আমার লিটারালি (আক্ষরিক অর্থে) ওদের জন্য মায়া লাগছে। আহা বেচারারা!”

এখন জাতির নমস্বদের কাছে ছোট্ট দুটি প্রশ্ন- প্রথমে ছাত্রলীগের সমালোচনায় পঞ্চমুখ এরপর ৪৮ ঘন্টা পার হতে না হতেই আবার অনেকটা প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এটা বটে কেমন রাজনীতি, শিক্ষানীতি, অর্থনীতি অথবা উর্ধ্বনীতি আমার জানা নেই, তেমনি এত ছোট জ্ঞানে এটা জানতেও চাইনা। তবে এই সুন্দর ঘটনা দ্বারা ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা কি তাদের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নৈরাজ্য, হানা-হানি, হামলা, মারামারি বন্ধ করে দিয়ে শিক্ষায় মনোনিবেশ করবে?? না কি স্যার মহোদয়ের এই ভালোবাসার কথায় সিক্ত হয়ে আবারো নতুন উদ্যমে হানা-হানি, হামলা, মারামারি শুরু করবে??

লেখক:

এস. এম সাজু আহমেদ

(সাংবাদিক ও কলাম লেখক)
ই-মেইল: [email protected]



মন্তব্য চালু নেই