টাইগারদের আক্ষেপের এক হার

জিতলে বিশ্বরেকর্ড, ড্র করলেও ছিল ইতিহাস গড়ার হাতছানি। টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে ৪৫৯ রান করে জেতার রেকর্ড নেই। আবার শেষ ইনিংসে ভারতের মাঠে ১২০ ওভারের বেশি খেলার উদাহরনও হাতে গোনা। ঠিক এমন কঠিন সমীকরণে দাঁড়িয়ে জয় কিংবা ড্র নয়, সহজ ফলটাই যোগ হয়েছে বাংলাদেশের নামের পাশে। সোমবার হায়দ্রাবাদ টেস্টের পঞ্চম ও শেষ দিনে বাংলাদেশ ২য় ইনিংসে ১০৩.৩ ওভারে ২৫০ রানে অলআউট। যার অর্থ ২০৮ রানে ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচটি জিতে নিল ভারত। ১২৫ ওভার ব্যাট করতে পারলেই আসত অবিশ্বাস্য এক ড্র!

তবে এমন হারে আক্ষেপ ছড়িয়ে থাকল। যদি একটা অথবা দুটো বড় জুটি হলেই হয়তো দিনটা পার করে দিতে পারতো টাইগাররা। ড্র করতে পারলেই তো ফলটা জয়ের স্বাদ হয়ে ধরা দিতো। দিনের খেলা ২৪.৩ ওভার মানে ঘন্টা দুয়েক বাকী থাকতে অলআউট হয়ে যাওয়াটা সত্যিই অনেক দিন পোড়াবে ক্রিকেটপ্রেমীদের। সাথে অবশ্যই পোড়াবে টাইগারদের।

ভারতে মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলতে নেমে টস ভাগ্যটা অবশ্য মুশফিকের পক্ষে ছিল না। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে স্বাগতিকরা ৬ উইকেট হারিয়ে ৬৮৭ রানের পাহাড়ে উঠে ১ম ইনিংস ঘোষণা করে। তারপর ১ম ইনিংসে ১২৭.৫ ওভারে ৩৮৮ রান তুলে অলআউট টাইগাররা। ফলো-অন না করিয়ে বিরাট কোহলির দল ৪ উইকেট হারিয়ে ১৫৯ রান তুলে ২য় ইনিংস ঘোষণা করে। এরপর ৪৫৯ রানের ‘মিশন ইমপসিবল’ পথটা পাড়ি দেয়া হয়নি সফরকারীদের।

সোমবার ২য় ইনিংসে ৩৫ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে ১০৩ রান নিয়ে দিন শুরু করে টাইগাররা। লক্ষ্য ছিল-গোটা দিন ব্যাট করে অন্তত ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়া। কেননা, এতো বড় চ্যালেঞ্জের জবাব দিয়ে জয়ের ইতিহাস নেই টেস্ট ক্রিকেটে। তার ওপর রাজিব গান্ধী স্টেডিয়ামে শেষ দিনে অশ্বিন-জাদেজাদের বিপক্ষে ব্যাট করাটা সহজ ছিল না। টেস্টে হার বাঁচানোর সেই কঠিন কাজটা করতে গিয়ে বাংলাদেশ একশ ওভারের বেশি খেলে ফেললেও বড় কোন জুটি পায় নি। সম্ভাবনা জাগিয়েই ফিরে গেছেন টাইগার ব্যাটসম্যানরা!

তবে একাই বেশ কিছুটা সময় লড়েছেন মাহমুদউল্লাহ। অনেক দিন পর টেস্টে তার ব্যাটে রান। সর্বশেষ হাফসেঞ্চুরিটা এসেছিল সেই ২০১৫ সালে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। এরপর ১০ ইনিংসে একটি চল্লিশ ছাড়ানো ইনিংস এসেছে তার ব্যাটে। এবার চাপের মুখে ব্যাট হাতে স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন তিনি। ১১৫ বলে অর্ধশতক তুলে ধৈর্য্যের পরিচয় দিচ্ছিলেন। কিন্তু সেই ইনিংসটাকে বড় করতে পারেননি তিনি। ফিরে যান ৬৪ রানে। ইশান্ত শর্মার শর্ট বলে পুল করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু টাইমিংটা ঠিক মতো হলো না! বল হাওয়ায় ভেসে জমা হল ভুবনেশ্বর কুমারের হাতে।

সকালটা শুরু হয়েছিল সাকিব আল হাসানের আউটে। দিনের তৃতীয় ওভারে ফিরেছেন। সঙ্গে ২২ রান। এরপর মুশফিকুর রহীমকে নিয়ে জুটি বাধেন মাহমুদুল্লাহ। মনে হচ্ছিল এই জুটিতেই ধাক্কা সামলে উঠবে বাংলাদেশ। তেমন সম্ভাবনাও জাগিয়েছিলেন দু’জন। কিন্তু আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান এবার পারলেন না। রবিচন্দ্রন অশ্বিনের ঘূর্ণি বলে সর্বনাশ। সামনে এগিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিডঅফে রবীন্দ্র জাদেজাকে ক্যাচ দেন তিনি। প্রশ্ন থাকছে-এমনটা করা কি খুব জরুরী ছিল? ২৩ রানে বিদায় বাংলাদেশ অধিনায়কের।

কিছুটা সময় লড়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজও। কিন্তু রবীন্দ্র জাদেজার বড় বাঁক নেয়া বলে বোকা বনে ক্যাচ দেন উইকেটরক্ষক ঋদ্ধিমান সাহার গ্লাভসে। তিনি করেন ২৩ রান। তারপরের ব্যাটসম্যান তাইজুল ইসলাম আর তাসকিন অাহমেদের আর কিছুই করার ছিল না! অশ্বিন-জাদেজাদের স্পিন খেলা তো আর ছেলের হাতের মোয়া নয়! ২৫০ রানে অলআউট দল। কামরুল ইসলাম রাব্বী ৭০ বল খেলার ধৈর্য্য দেখিয়ে ৩ রানে অপরাজিত।

অশ্বিন-জাদেজা দুই স্পিনার ভাগাভাগি করে নিয়েছেন ৪টি করে আটটি উইকেট। বাকী ২ উইকেট ইশান্ত শর্মার। তবে এই টেস্টের সেরা ক্রিকেটার সেই ডাবল সেঞ্চুরিয়ান বিরাট কোহলি। স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ও রাহুল দ্রাবিড়কে পেছনে ফেলে টানা ৪ সিরিজে দ্বি-শতক করেন ভারত অধিনায়ক।

প্রথমবারের মতো ভারতের মাঠে টেস্ট খেলতে হার নিয়েই ফিরতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। অনেক ভুলের হায়দ্রাবাদ টেস্টে মুশফিকের লড়াকু সেঞ্চুরি ছাড়াও অবশ্য কিছু পাওয়ার আছে। দুই ইনিংসেই ১০০ ওভারের বেশি খেলেছে টাইগাররা। পঞ্চম দিনে জেদি লড়াইটাও জমে উঠছিল। সাকিব-তামিম-মেহেদীদের ঢাকার বিমান ধরার সময় নিশ্চয় একটি কথাই বারবার বাজবে মনে। ইশ! প্রথম ইনিংসে ভারতের এতগুলো ক্যাচ, রান আউট ও স্টাম্পিং যদি মিস না হতো!

সংক্ষিপ্ত স্কোর :
ভারত ১ম ইনিংস : ১৬৬ ওভারে ৬৮৭/৬ ইনিংস ঘোষণা (রাহুল ২, বিজয় ১০৮, পুজারা ৮৩, কোহলি ২০৪, রাহানে ৮২, ঋদ্ধিমান ১০৬*, অশ্বিন ৩৪, জাদেজা ৬০*; তাসকিন ১/১২৭, রাব্বি ০/১০০, সৌম্য ০/৪, মিরাজ ২/১৬৫, সাকিব ০/১০৪, তাইজুল ৩/১৫৬, সাব্বির ০/১০, মাহমুদুউল্লাহ ০/১৬)। এবং ভারত ২য় ইনিংস : ১৫৯/৪ ইনিংস ঘোষণা (পুজারা ৫৪, কোহলি ৩৮, রাহানে ২৮; তাসকিন ২/৪৩, সাকিব ২/৫০)

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ১২৭.৫ ওভারে ৩৮৮/১০ (তামিম ২৪, সৌম্য ১৫, মুমিনুল ১২, মাহমুদউল্লাহ ২৮, সাকিব ৮২, মুশফিক ১২৭, সাব্বির ১৬, মিরাজ ৫১, তাইজুল ১০, তাসকিন ৮; ভুবনেশ্বর ১/৫২, ইশান্ত ১/৬৯, অশ্বিন ২/৯৮, যাদব ৩/৮৪, জাদেজা ২/৭০) এবং বাংলাদেশ ২য় ইনিংস ১০৩.৩ ওভারে ২৫০/১০ (সৌম্য ৪২, মুমিনুল ২৭, মাহমুদউল্লাহ ৬৪, সাকিব ২২, মুশফিক ২৩, সাব্বির ২২,মেহেদী ২৩; অশ্বিন ৪/৭৩, জাদেজা ৪/৭৮, ইশান্ত ২/৪০)

ফল: ভারত ২০৮ রানে জয়ী

ম্যাচসেরা: বিরাট কোহলি।



মন্তব্য চালু নেই