খালেদার অফিসে কৌশলে খাবার প্রবেশেও ব্যর্থ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশান অফিসে চার দিন ধরে বাহির থেকে সরবরাহ খাবার প্রবেশ করতে দিচ্ছে না পুলিশ। এমনকি শুভাকাঙ্ক্ষীদের আনা খাবার প্রবেশেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোনো বেলায় উপোস আবার কোনো বেলায় শুকনো খাবার খেয়ে দিনানিপাত করছেন অফিসের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির কারণে দফায় দফায় খাবার প্রবেশের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে কৌশল অবলম্বন করা হয়। তাতেও কোনো লাভ হয়নি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যালয়ে খাবার প্রবেশে বাধার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি।

এ ব্যাপারে চেয়ারপারসনের সঙ্গে তার কার্যালয়ে অবস্থানকারী প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান  জানান, ‘আমরা ভিন্ন কৌশলে খাবার প্রবেশের চেষ্টা করি। রাত ১১টার দিকে কার্যালয়ের দারোয়ানকে দিয়ে বাইরে থেকে কিনে কয়েক প্যাকেট খাবার আনা হয়। প্রায় ১ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখার পরও খাবার প্রবেশ করতে দেয়নি পুলিশ। পরে তাকে তাড়িয়ে দেয় পুলিশ। ওই রাতে আমরা শুকনো খাবার খেয়েছি।’

তিনি আরও জানান, ‘ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনের বৈঠকের পর আমরা কয়েক মিলে কার্যালয়ের নিজ তলায় কথা বলছিলাম। এরই মধ্যে খাবারের ভ্যান কার্যালয়ের সামনে আসে। কিন্তু পুলিশ খাবারসহ ভ্যান নিয়ে যায়। এর পর থেকেই এখন (শনিবার রাত) পর্যন্ত আর খাবার প্রবেশ করতে দিচ্ছে না পুলিশ।’

কার্যালয়ে অবস্থানকারী প্রেস উইংয়ের আরেক সদস্য শামসুদ্দিন দিদার শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে বলেন, ‘আমাদেরকে শুকনো খাবার খেয়ে থাকতে হচ্ছে।’

রাতে বাহির থেকে খাবার আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খাবার নিয়ে আসার সুযোগ নেই।’

এর আগে দুপুরে শামসুদ্দিন দিদার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা গত চার দিন ধরে না খেয়ে আছি। শুকনো খাবার খেয়ে সময় পার করছি। সাংবাদিকদের মাধ্যমে সরকারের কাছে জানতে চাই? আমরা কী কারারুদ্ধ? তাহলে জেলখানায়ও তিন বেলা খাবার দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের সেটাও দেওয়া হচ্ছে না।’

‘আমাদের দোষ কী? বেগম জিয়া কার্যালয়ে আছি এটাই কী আমাদের দোষ, এটাই কী আমাদের পাপ’ এমন প্রশ্নও রাখেন সাংবাদিকদের কাছে তিনি।

কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, খালেদার জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে মিলাদ মাহফিল পড়ার জন্য কার্যালয়ে আসা হুজুরদেরকেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক জানিয়েছেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার খাবার বন্ধ করা হয়নি। তার খাবার নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি খাবার খাচ্ছেন ও সুস্থ আছেন। চাইলে আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।’

২৯ জানুয়ারি নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এক সমাবেশে বলেছিলেন, ‘আন্দোলন থেকে সরে না আসলে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ, খাবার, পানিসহ সব কিছু বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর একদিন পরই কার্যালয়ের বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ক্যাবল টিবি, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ফোন, ফ্যাক্স সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। তারপর প্রায় ২০ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়। কিন্ত বিচ্ছিন্ন থেকে যায় অন্যান্য সংযোগ।

তবে কার্যালয়ের আশপাশের অ্যাম্বাসিগুলোর অভিযোগের প্রক্ষিতে ১১দিন পর মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল করা হয়। ফলে খালেদার কার্যালয়েও মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় বলে জানা যায়।

কার্যালয় সূত্রে আরও জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে নাস্তার প্যাকেট কার্যালয়ে পেছনের লেকপাড় দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির কারণে নাস্তার প্যাকেট নিয়ে কার্যালয়ের আশপাশেও ঘেঁষতে পারেনি দারোয়ান। পুলিশি বাধার কারণে দুপুর খাবার আসেনি। তবে কার্যালয়ে অবস্থানকারী দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমানের বাসা থেকে আসা কিছু শুকনো খাবার, পিঠা প্রবেশের অনুমতি দেয় পুলিশ। ওই রাতে কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মিলাদ মাহফিলের তবারক খেয়ে সময় পার করেন তারা। এদিকে ওইদিন বিকেলে মিলাদ মাহফিল পড়ার জন্য চারজন হুজুর আসলে দুইজন ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয় পুলিশ।

এ ছাড়া শুক্রবার সকালের নাস্তা হিসেবে চিড়া, মুড়ি ও খেজুরসহ শুকনা খাবার খান খালেদার জিয়ার অফিস স্টাফরা। ওই দিন দুপুরে ১২০ প্যাকেট খাবার নিয়ে একটি ভ্যান কার্যালয়ের সামনে আসে। কিন্তু পুলিশ খাবারের ভ্যানটি গুলশান থানায় নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার দুপুরে সেলিমা রহমানের বাসা থেকে পাঠানো খাবার খান তারা।

আগের তিন দিন খাবারের ভ্যান ফিরিয়ে দেওয়া হলে শনিবার কৌশল পাল্টে খাবার প্রবেশের চেষ্টা করে কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। সিএনজিতে করে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে খাবার নিয়ে আসা হয়। এবারও খাবার ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়নি পুলিশ। খাবারসহ সিএনজি গুলশান থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

১০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে কাযার্লয়ের সবরাহ করা খাবারের ভ্যান ফিরিয়ে দেয় দায়িত্বরত পুলিশ। ওই রাতেই দ্বিতীয় দফা খাবার আনা হলেও প্রবেশের অনুমতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। হঠাৎ করেই খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়ে কার্যালয়ের অবস্থানকারী কর্মকতা-কর্মচারীরা। পূর্বপ্রস্ততি না থাকায় তারা ওই রাতে শুকনো খাবার খেয়ে কাটাতে হয়।

অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ও সাবেক চিফ হুইপ জাহেদ আলীর চৌধুরীর ছেলের বৌ শেনওয়া চৌধুরী খালেদা জিয়ার জন্য শনিবার চারটার দিকে ভালবাসা দিবসে শুভেচ্ছা জানাতে ফুল ও কিছু কাঁচাবাজার নিয়ে আসেন। কিন্তু কার্যালয়ের সামনে দায়িত্বও স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের কর্মকর্তা তাকে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।

তবে প্রায় প্রতিদিনই খালেদা জিয়ার জন্য তার বড় বোন সেলিনা ইসলাম। এছাড়াও তার ভাই সাঈদ এস্কান্দরের স্ত্রী নাসরিন সাঈদ ও শামীম এস্কান্দরের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা কার্যালেয় আসেন। তারা মাঝে মধ্যে খাবার নিয়ে আসেন। এছাড়া বড় ছেলে তারেক রহমানের শ্বশুরের বাসা থেকে খাবার পাঠানো হয়।

কার্যালয়ে ৩ জানুয়ারি রাত থেকে ‘অবরুদ্ধ’ জীবন যাপন করছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ওই রাত থেকেই দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, উপদেষ্টা সাবেক আইজি এমএ কাইয়ুম, প্রেস সচিব, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানাসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী ও কার্যালয়ের কর্মচারী এবং নিরাপত্তাকর্মী মিলিয়ে প্রায় অর্ধ শতাধিক লোক কার্যালয়ে অবস্থান করছেন।



মন্তব্য চালু নেই