‘কিতালটিউব’ দিয়ে অনলাইনে সক্রিয় জঙ্গিরা!

নিষিদ্ধ হওয়ার পরও নামে-বেনামে জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গিরা। প্রকাশ্য কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর আন্ডারগ্রাউন্ডে কিংবা অনলাইনে কার্যক্রম বেড়েছে জঙ্গি গোষ্ঠীর। দেশে দীর্ঘ সময় ধরে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে সরকার।

জঙ্গিদমনে বেশ কিছু সফল অভিযানও চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবু জঙ্গিবাদের শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রশিক্ষিত বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকতে জঙ্গি সদস্যদের নানা রণকৌশল শেখাচ্ছে জঙ্গি নেতারা।

গত পাঁচ বছরে জঙ্গিদের মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে প্রযুক্তি শিক্ষায় পারদর্শী যুবক-তরুণেরা। নিজেদের দলে ভেড়াতে প্রযুক্তি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তারা।

ভার্চুয়াল দুনিয়াকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিবাদের কার্যক্রমকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে নিমিষেই। দেশে বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু তাদের কার্যক্রম থেমে নেই। জঙ্গিবাদের মতবাদ ছড়িয়ে দিতে তারা এখন অনলাইনকে বেছে নিয়েছে। অনুসন্ধানে জঙ্গি বানানোর এমনই এক ডিজিটাল কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। এর নাম ‘কিতালটিউব’।

পুরো সাইটটির ঠিকানা-কিতালটিউব ডট ব্লগস্পট ডটকম (qitaltube.blogspot.com)। অডিও-ভিডিওবার্তা নির্ভর এ সাইটটি উগ্রবাদীদের বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গত তিন বছর ধরে নির্বিঘ্নে অনলাইনে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গিরা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন ও এর তৎপরতা অনেক আগেই নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তাহলে অনলাইনে যে জঙ্গিবাদের মতবাদ প্রচার-প্রসার চলছে, এসব ঠেকাবে কে? অনলাইনে দীর্ঘদিন ধরে চলা এ কার্যক্রম বন্ধে সরকারি কোনো সংস্থা ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? নাকি তারা জানেই না!

যদিও সাইবার ক্রাইম ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় প্রতিটি শাখায়-ই বিশেষ সেল রয়েছে। তবুও নাকের ডগায় বসে অনলাইনে জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় জঙ্গিরা; যেন দেখার কেউ নেই।

তবে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুল হক বলেন, আমাদের গোয়েন্দারা সব দিক দিয়ে সঠিকভাবে তদন্ত করার ফলেই জঙ্গিদের একের পর এক আস্তানা খুঁজে বের করছে। যে সাইটগুলোতে জঙ্গিরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সেগুলোও গোয়েন্দা নজরদারিতে আছে।

কিতালটিউবের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, পুরো সাইটটিই জঙ্গিবাদের আবর্তে মোড়ানো। সেখানে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেতা শাইখ তামিম আল আদনানী হাফিজাহুল্লাহর অডিও-ভিডিওবার্তা জুড়ে দেয়া হয়েছে। আবার বাংলা ও ইংরেজিতে বিদেশি জঙ্গি নেতাদের বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। আল কায়েদা ও তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠানোর আহবান জানানো হয়েছে।

মাশরাফি-সৌম্য-রুবেলসহ জাতীয় ক্রিকেট দল ও ব্যা- সঙ্গীতশিল্পীদের ছবি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি আমরা?’, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ইমাম ও পুলিশ প্রধানের ছবি ব্যবহার করে বলা হয়েছে, ‘খুৎবা নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা, তাওহিদী জনতা রুখে দাঁড়াও!’, শোলাকিয়ার প্রধান ইমাম মাওলানা ফরিদউদ্দীন মাসউদের ছবি দিয়ে বলা হচ্ছে, ‘দরবারী আলেমদের জিহাদ বিরোধী ফতোয়া থেকে সাবধান’, জঙ্গিদের ছবি দিয়ে বলা হচ্ছে, ‘কাবার রবের শপথ! আমরা সফল হয়েছি’, নিহত ব্লগারদের ছবিতে বলা হয়েছে, ‘আনসার আল ইসলামের হৃদয় প্রশান্তকারী একটি অভিযান’।

এরকম অনেক ‘জিহাদী’ বার্তা দেয়া হচ্ছে কিতালটিউবের মাধ্যমে। আর এভাবেই অনলাইনে নিজেদের প্রচার ও প্রসারে কাজ করছে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদা মতাদর্শের আনসার আল ইসলাম কিংবা এবিটি।

অনলাইনে জঙ্গিবাদের এ প্রচারণার মূল কাজটি করছে তিতুমীর মিডিয়া নামে একটি ‘প্রতিষ্ঠান’। সবকটি অডিও-ভিডিওবার্তায় তিতুমীর মিডিয়ার লোগো ব্যবহৃত হচ্ছে। গত দুই বছরে আল কায়েদার আদলে তৈরি আনসার আর ইসলামের বিভিন্ন আপডেট ও মতাদর্শিক বয়ান এসব ওয়েবসাইটে প্রচারিত হচ্ছে।

কিতালটিউব ছাড়াও দাওয়াহইলাল্লাহ, ইসলামের আলো ইত্যাদি আরও বেশ ওয়েবসাইট এখনও চালু আছে। এসব সাইটকে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এবিটির’ বলার চেয়ে বাংলাদেশি আল কায়েদা নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইট বলাই ভালো। কারণ এসব ওয়েবসাইটে এবিটির আলাদা কোনো ব্র্যান্ডিং করা হয়নি। তার বদলে ‘তিতুমীর মিডিয়া’, ‘বালাকোট মিডিয়া’ ইত্যাদি আল কায়েদাপন্থি মিডিয়ার অনলাইন কার্যক্রম চালানোয় এসব সাইটের কাজ।

এসব মিডিয়া আল কায়েদার আস-সাহাব মিডিয়া ও আল কায়েদাপন্থি অন্যান্য মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর, বক্তৃতা ইত্যাদি বাংলায় অনুবাদ করে প্রচার করে থাকে। এসব সাইটের মাধ্যমে ব্লগারদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে প্রচার চালানো হয়েছে। এসব ওয়েবসাইটের মধ্যে একমাত্র কিতালটিউবেই এবিটি কিংবা আনসার আল ইসলামের নামে আলাদা কিছু প্রচারণা আছে।

আর তা করা হয়েছে পাকিস্তানভিত্তিক আল কায়েদাপন্থি ফোরাম বাব-উল-ইসলামের ব্যানারে। আনসারুল্লাহর সবচেয়ে বেশি ব্র্যন্ডিং হয়েছে বাব-উল-ইসলামে সাইটেই (bab-ul-islam.net)।

তিতুমীর মিডিয়া এবং বালাকোট মিডিয়া তাদের লোগোতে যে পতাকার ব্যবহার করছে, তা মূলত আল কায়েদার পতাকা। কিন্তু এবিটি যে লোগো ব্যবহার করে, সেটি আইসিসের (ISIS) পতাকা। আর এই পতাকা লোগোযুক্ত ব্যানারটিই অভিজিৎ হত্যাকান্ডের প্রথম দায় স্বীকারকারী টুইটার পেজ ‘আনসার বাংলা -৭’ এর ব্যানার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

কিতালটিউবের একটি ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মিতু হত্যার বিষয়ে বলা হচ্ছে, ‘চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক হত্যাকা-ের বিষয়ে মিডিয়া ও পুলিশ জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তারা এ হত্যাকা-ের দায়ভার আনসার আল ইসলামের মুজাহিদীনদের ওপর চাপাতে চাচ্ছে।’ সেই ভিডিওবার্তায় পুলিশপ্রধানসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার ছবি, টিভি টকশো ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, বিভিন্ন টিভি সংবাদের ক্লিপিংস ব্যবহৃত হয়েছে।

সেখানে আরও বলা হয়েছে, ‘হে প্রিয় উম্মাহ, আমরা আপনাদের জানিয়ে দিতে চাই, আল কায়েদা কর্মীগণ বিনা অপরাধে নারী-পুরুষ হত্যাকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না। আল কায়েদার মুজাহিদগণ এ পর্যন্ত যতগুলো ‘বরকতময়’ আক্রমণ করেছে, তা শরীয়তের মাপকাঠিতে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ লক্ষ্যবস্তুতেই করেছে। সুতরাং মিডিয়ার মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হবেন না।’

ভিডিওবার্তায় এ যাবৎকালে যতগুলো ব্লগার, লেখক-প্রকাশ খুন হয়েছেন তাদের ছবি ও হত্যাকাণ্ডের সময় লেখা গ্রাফিক ব্যবহৃত হয়েছে। ‘যে জিহাদ শরীয়ত অনুযায়ী পরিচালিত হয় না, তা ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে’ বলেও দাবি করা হয়েছে ওই ভিডিওবার্তায়।

২০১৩ সালের আগস্টে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের-এবিটির প্রধান জসিম উদ্দীন রহমানীকে গ্রেফতার হন। এর পর থেকেই মূলত আলোচনায় আসে এবিটি। এর পরের বছর নভেম্বরে গ্রেফতার হন এবিটির মিডিয়া প্রধান সাবেক ‘ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে’র ছাত্র মোরশেদ আলম। একই বছর গ্রেফতার হন নাঈম নামে এবিটির আরেক শীর্ষ জঙ্গি নেতা।

নাঈমের স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে, আনসারুল্লাহর অপারেশন কমান্ডার ইজাজ হোসেইনের নাম। জসিমউদ্দীন রহমানী গ্রেফতারের পর তার নির্দেশেই চলছে এবিটির সার্বিক কার্যক্রম। বিদেশে বসে অনলাইনেই সংগঠনের সার্বিক কার্যক্রম তদারক করেন তিনি।

তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, দুই বছর আগে এবিটির মিডিয়া প্রধান মোরশেদ গ্রেফতার হলেও অনলাইনে তিতুমীর মিডিয়া ও বালাকোট মিডিয়ার নামে এসব ওয়েবসাইটগুলো নিয়মিত আপডেট হচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক জঙ্গি প্রচারণা ও রিক্রুটমেন্ট বন্ধ করতে কিংবা এধরনের কার্যক্রমের ডকুমেন্টেশন করার ক্ষেত্রেও পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এর আগে ২০১১ সালের মার্চে জেএমবির প্রচার বিভাগের প্রধান আবদুল গনি, রিক্রুটমেন্ট কো-অর্ডিনেটর আবু হুরাইরা শামস এবং ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর আশরাফুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। সে সময় তাদের কাছ থেকে ২০টি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়, যা দিয়ে তারা অনলাইনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হিযবুত তাহরিরের আইটি বিশেষজ্ঞদের সাথে মতবিনিময় করা হতো এবং অনলাইনে নতুন সদস্য সংগ্রহের কাজ চলতো।

গত এক দশক ধরে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলো অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগ, প্রচার প্রচারণা এবং রিক্রুটমেন্টের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আল কায়েদা নেতা আনওয়ার আল অওলাকি ইন্টারনেটভিত্তিক জঙ্গিবাদের প্রধান নেতা ছিলেন। অনারব ও ইংরেজি জানা মুসলিমদের মাঝে জঙ্গিবাদের দীক্ষা ছড়িয়ে দিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন তিনি।

বাংলাদেশে অওলাকির অনুসারী জসিম উদ্দীন রহমানীও একই কায়দায় জঙ্গিবাদ বিস্তারে কাজ শুরু করেছিলেন। আর তাই গত কয়েক বছরে অনলাইনকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উগ্র চেতনার প্রচার-প্রসার ও রিক্রুটমেন্টের কাজ এগিয়েছে। এরপর থেকে পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপের দিকেই গেছে, যা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, তারা আল কায়েদার আমীর আইমান আল জাওয়াহিরির নির্দেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ এশিয়া মহাদেশের দেশসমূহে সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে ইসলামিক শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘জিহাদ’ করছে।

এর অংশ হিসেবে তারা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারসহ এশিয়ার দেশগুলোকে টার্গেট করে ‘আকিস’ (AQIS-AL QAIDAH IN INDIAN SUB-CONTINENT)) গঠন করে। আকিসের পতাকাতলে এসে জাওয়াহিরির বক্তব্য বাংলায় তরজমা করে অনলাইনে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে, ‘মুজাহিদ’ সংগ্রহের জন্য। এসব ভয়ঙ্কর জঙ্গিরা ইসলাম ও হযরত মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটুক্তিকারীদের শনাক্তে অভিনব কৌশলের আশ্রয় নেয়।

কৌশলের অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন প্রগতিশীল ব্লগে ছদ্মবেশে অ্যাকাউন্ট খোলে। এর পর টার্গেট করা ব্যক্তির ওপর নজরদারি শুরু করে। একপর্যায়ে টার্গেট ব্যক্তির নাম-ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য অপারেশন টিমকে সরবরাহ করে। এভাবেই তারা ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যা এবং ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, দ্বীপ আজাদ ও রাকিব মামুনসহ টার্গেট ব্যক্তির ওপর হামলা চালায়।

এ বিষয়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান বলেন, গোয়েন্দারা জঙ্গিদের পরিচালিত অনেকগুলো সাইট বন্ধ করে দিয়েছে। সেসব সাইট খুলে কে বা কারা জঙ্গিবাদের প্রচারণা চালাচ্ছে, তার-ও খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে জড়িত অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে।

আবার কিছু সচল সাইট নজরদারিতে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কতগুলো সাইট বন্ধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি র‌্যাবের দায়িত্বশীল এই কর্মকর্তা।



মন্তব্য চালু নেই