আমাকে তারকা বলে ডাকা হয় কিন্তু আমি তা নই: ডেনজেল ওয়াশিংটন

বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম এক অভিনেতার নাম ডেনজেল ওয়াশিংটন। ক্যারিয়ারটা মঞ্চে শুরু করলেও সিনেমাতেই থিতু হোন তিনি। প্রথম দিকে অভিনয়ে স্ট্রাগলিং করে উঠা এই অভিনেতা সফলতার দেখা পান নব্বইয়ের দশক থেকেই। ‘দ্য হারিকেন’ সিনেমার মধ্য দিয়ে তুমুল আলোচনা তৈরি করেন তিনি। সেসময় বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন ডেনজেল ওয়াশিংটন। স্টিভ বিকো, ম্যালকম এক্স, রুবিন হারিকেন কার্টার, মেলভিন বি টলসন, ফ্র্যাংক লুকাস এবং হারমান বুনের মতো বাস্তব চরিত্রগুলোর যেনো মালিকানা নিয়ে নেন তিনি। দুবার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড ও গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড জয়ী তুখোড় এই অভিনেতা ‘দ্য টকস’-এ একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ২০১২ সালে। পাঠকদের জন্য যা ভাষান্তর করেছেন অজয় চৌধুরী…

মি. ওয়াশিংটন। আপনি কি মন্দ চরিত্রে কাজ করতে ভালো লাগে?
একজন অভিনেতা হিসেবে থিয়েটারে আপনাকে শেখানো হয় আপনি কখনো একটা মন্দ চরিত্রে কাজ করবেন না। আপনি যা ভালোবাসেন তাই করবেন। আপনি বলতে পারেন না ‘আহ্, আমি খারাপ লোক’ কিভাবে ওটি অভিনয় করবো?

আপনার ব্যক্তিত্বে কখনো প্রভাব ফেলে যখন আপনি একটি কালো চরিত্রে অভিনয় করেন?
না, আমার জন্য এটি এখনো একটি উইল। এটা এখনো আধ্যাত্মিক যাএা। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী আমি মানুষে ভয় করি না, আমি ঈশ্বরে ভীত।

আপনি কি ধার্মিক মানুষ?
আমি ধর্ম নিয়ে কথা বলছি না, আমি আধ্যাত্মিকতা নিয়ে কথা বলছি।

পার্থক্য কি?
ধর্ম আমার কাছে এমন যে মানুষ যখন আধ্যাত্মিকতাকে ধারণ করে ‘আমার ঈশ্বর সঠিক, তোমার ঈশ্বর ভুল।’ ‘ধর্ম আমার কাছে মানবিক গুণাবলি।’ যদি আপনি মুসলিম হন তবে আপনি খ্রিস্টান হতে পারবেন না। এটিই আমার কাছে ধর্ম। যখন আমরা বলি ‘ওহ, ঈশ্বর তোমাকে বাচাবে না। তোমাকে মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার আপেলের রস খাওনি, তোমাকে নরকের আগুনে পোড়াবে’-কি পাগলামী এসব। যাই হোক, আমি দু:খিত। আমার এই বিষয়ে কোন মতামত নেই। আছে কি ? (হাসি)

আপনাকে হাসিখুশি দেখাচ্ছে। স্ক্রিনে সচারচর এমন দেখা যায় না…
এটা সত্যি নয়।

আচ্ছা, নিঃসন্দেহে আপনি অনেক বেশি হাস্যরস করেন না…
এটা আমার চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। প্রথমত, আমি ছিলাম জীবনী মানুষ(হাসি) ‘স্টিভ বিকো’? বুঝেছো জীবনী মানুষ! ম্যালকম এক্স? জীবনী মানুষ! টাইটানকে মনে করে? জীবনী মানুষ! হ্যারিকেন? পেয়েছো জীবনী মানুষকে! তারপর কেউ আচমকা পা পিছলে ফেলে দিলো রঙ্গমঞ্চের জীবনে। ‘মন্দ লোকটাকে পেয়েছো! মন্দ লোকটা’ আমি মনে করি এটাই প্রকৃতির নিয়ম!

আপনি প্রায়ই নানা চরিত্র ফেরৎ পাঠান কারন সেগুলো আপনার ব্যক্তিত্বের সাথে মানানসই হয় তাই?
অবশ্যই। আমার জীবিকা নির্মিত হয় না বলায়। অনেক, অনেক বছর আগে সিডনি পটেয়ার আমাকে বলেছিলো প্রথম চার বা পাঁচটা ছবি করে তুমি বুঝে যাবে বাজারে কীভাবে তোমায় চিনবে! আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম আমি দ্বিতীয় ছবি যেটি করেছিলাম নরম্যান জিসমের সাথে, তৃতীয় সিডনি লুমেটের এবং চতুর্থটা করেছিলাম রিচাড এথেনব্রোথ কে নিয়ে ক্রাই ফ্রিডম, যার জন্য আমি প্রথমবার অস্কারে মনোনীত হয়েছিলাম । আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম। যেখানে অন্য একটি ছবিও ছিলো যা করতে পারতাম কিন্তু করিনি।

অন্য কোনটার মতো?
যাদের মধ্যে আমি বলতাম ‘দ্য নিগার দে কুনই’স কিল। ‘এটা ছিলো ভয়াবহ। তারা বলে’ এটি ছিলো হাস্যকস! হ্যা, সঠিক। তাই ছবিটি আমি করিনি। তারা অনেক টাকা দিতে চেয়েছিলো এবং আমি সেরকমই ভেবেছিলাম, কিন্তু আমি ছবিটি করিনি। আমি ছয় মাস অপেক্ষায় ছিলাম তারপর ‘ক্রাই ফ্রিডম’-এর অফার পেয়েছি। তাই আমি তরুণ অভিনেতার যা বলি ‘তোমাদের আপোস করতে হবে না, থিয়োটারে যাও কাজ করো এবং অপেক্ষা করো।’

কথাটা বলা সহজ কিন্তু যখন কেউ আপনাকে ২০ মিলিয়ন ডলার দেবে…
এই গতিময় সমাজ ও ব্যবসায়ী দুনিয়ায় এটি খুব দূর্ভাগ্যজনক যে অনেক তরুণরা সুযোগ পাচ্ছে না তাদের উৎকর্ষ বাড়াতে। তাদের অবয়বটা আছে আর যাই হোক, এবং ২০ বছর বয়সেই তারা সাফল্য লাভ করছে, আর সত্যিই তারা কখনো শেখেনি কীভাবে অভিনয় করতে হয়। যারা থিয়েটারে কাজ করে আসছে তাদের সবাইকে আমি সম্মান করি। ভিওলা ডেভিস, মেরি স্টিপ, তারা উভয়ই থিয়েটার থেকে এসেছে, তুমি জানো?

আপনিও তো থিয়েটার থেকে প্রশিক্ষিত ছিলেন হলিউডে বড় তারকা হওয়ার পূর্বে, তাই না ?
আচ্ছা, আমি হলিউডের বড় তারকা নই। আমি একজন অভিনেতা। আমাকে তারকা বলে ডাকা হয় কিন্তু আমি তা নই। প্রথমত, আমি একজন মানুষ; আমার পেশা অভিনয়। মানুষ আপনাকে পদবী দেয়। তারা বলে, তুমি পরবর্তী তারকা, তারপর বলে তুমি তারকা হয়েছো, তারপর তুমি ধ্বংস হয়ে যাওয়া তারকা।(…হাসি) তাই এসব আমি লুফে নিই না। আমার কাজ আর আমার পেশা হলো অভিনয়।

‘সিনে তারকা’-এই উপাধিতে আপনি বিরক্ত?
আমি প্রশিক্ষিত অভিনেতা। অন্যরা আমাকে কে কি বলছে এবং সেটা ভালো কিন্তু আমি সেভাবে চলি না। শোন! আমি একজন সিনেমার তারকা। আমার গাড়িটা নিয়ে আসবেন? আমি শুধুমাত্র একজন পেশাদার বিনোদনকারী।

আপনি কি মনে করেন ‘স্টুডিও স্টিস্টেম’ খারাপ অভিনেতাদের সুযোগ দিচ্ছে প্রধান চরিএগুলোতে?
ভালো, প্রথমত আমি জানি না যে ‘স্টুডিও সিস্টেম’ কি! আমি মনে করি না এটা কোন ব্যবস্থা। এটি একটি শাখা যেখানে কিছু মানুষ চেষ্টা করছে দ্রুত ধনী হতে। এটিই হলো যা ওখানে কোন সমিতি নেই যেখানে তারা একসাথে বসে। সেটিই ব্যবস্থা। এটা এমন, যদি জো ব্লাক অকস্মাৎ ১০০ মিলিয়ন ডলায় পায়, আরো ১০ জন জো ব্লাক কে বের করো। আমি মনে করি এটি ব্যবসার ধরণ। আমি মনে করি, নারীদের উপর ব্যবসাটা কষ্টকর, সেটা কালো কিংবা সাদা যাই হোক।

আপনার ৪০টি ছবি জনপ্রিয় এবং তা আপনার জন্যই হয়েছে…
কিন্তু একজন ব্যক্তি হতে পরে ৭০ বছর বয়সী এবং কোনভাবে সে এখনো ২৩ বছরের নারীকে পায়! আমি মনে করি এখানে অব্যশই প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে উৎকর্ষ সাধনের বিষয় থাকে- যা ব্ল্যাক স্টুডিওর মাথায় ছিলো না। কিন্তু তোমার খোঁজ রাখা স্টুডিওর কাজ নয়। মানুষ সে গল্পই বলে যা সে জানে।

কী বোঝাতে চান ?
আমি মনে করি তুমি আফ্রিকা-আমেরিকান শহরের গভীরে অবস্থিত ফিলেডেলফিয়াকে নিয়ে কাহিনী তৈরি করবে। আমার তেমন মনে হয় না। আমি মনে করি না, একটি ছবি তৈরি করবো যে ষোল বছর ধরে বেড়ে উঠেছিলো বার্লিনে। কারন সেটা আমার জানা নেই। তুমি তাই লিখবে তুমি যা জানো। এবং ওখানে অর্থনৈতিক সীমা আছে। ষোল বছরের বার্লিনের তরুণকে নিয়ে একটি ছবি, তারা মনে হয় না ১০০ বিলিয়ন হলিউডে তৈরি করবে। এর মানে কি এই যে তারা বার্লিনের ষোল বছরের একটি ছেলের বিরুদ্ধে সংস্কারবাদী?

সত্যিই! প্রায়সময় মানুষ এসব বিষয়ে জানতে চেষ্টা করে…
একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘ওহ, এটা কি বৈষম্য নয় যে ম্যালকম ছবিতে আপনি অস্কার পান নি?’ আমি বলি, আমি আল-পাচিনোকে এগিয়ে রাখবো। তিনি আটবার মনোনীতি হয়েছিলো কিন্তু পান নি। আমি তিনবার মনোনীত হয়েছি এবং ইতিমধ্যে পেয়েছি। আপনি কি মনে করেন তারা কি ইটালিয়ান আমেরিকানদের অপছন্দ করেন! কি কারণ থাকতে পারে যে সে পায় নি, কিন্তু সে তবুও সিনেমা করেছিলো। তারা (অস্কার কমিটি) কি সংস্কারবাদী ছিলো? হ্যাঁ, উভয় পক্ষেই, পুরো পক্ষেই। ওগুলো মানবিক বৈশিষ্ট। এটাই কি একমাত্র কারণ? না, আমি বিশ্বাস করি না। আমি জীবন্ত উদাহারণ- যা সত্যি নয়।



মন্তব্য চালু নেই