মেইন ম্যেনু

নৌ-পরিবহন

যেখানে অনিয়মই ‘নিয়ম’, মানুষ মরলে দায় কার?

দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে নৌপথ ও নৌ-পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ মাধ্যমটি দিয়েই প্রতিবছর দেশের প্রায় ৩৫ ভাগ যাত্রী যাতায়াত ও ৯০ শতাংশ মালামাল স্বল্প খরচে পরিবহন করা হয়। নানা যৌক্তিক কারণে এ ব্যবস্থাটি বেশ জনপ্রিয়, সহজলভ্য ও আরামদায়ক ভ্রমণের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও আনিয়ম ও ত্রুটির জন্য তা পরিণত হচ্ছে প্রাণহানির কারণ। নৌপরিবহান অধিদপ্তর ও বেসরকারি বেশ কয়েকটি সংস্থার নিজস্ব অনুসন্ধানে নৌ-পরিবহনের বর্তমান করুণ চিত্র উঠে এসেছে।

দুর্ঘটনার কারণ:
সম্প্রতি দেশের নৌযানগুলোর ওপর পরিচালীত বেসরকারি সংস্থা কোস্ট ট্রাস্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নৌযান নির্মাণে নাকশায় ত্রুটি, অতিরিক্ত যাত্রী, চালকের অদক্ষতা ও কার্যকর তদারকি না করার করণে দেশে নৌ দুর্ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া যেসব লঞ্চ পুরোনো নকশায় নির্মিত সেগুলোও বর্তমান সময়ে দুর্ঘটনায় পড়ে।

সম্প্রতি দুর্ঘটনা কবলিত এমভি শাথিল-১ ও এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চ দু’টির কারিগরি ও কাঠামোগত ত্রুটি ছিল। এর আগেও শাথিল-১ একবার দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। যে নকশায় এ লঞ্চটি তৈরি ২০০৬ সাল থেকেই তা অনুপযুক্ত বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর এপ্রিল থেকে মে মাসেই বেশি নৌ দুর্ঘটনা ঘটে। এ মাস দু’টি নৌযানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তাতে কাযর্কর কোনো ব্যবস্থা নেই সংশ্লিষ্টদের।

নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন জোট নামে এক সংগঠনের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশে যতো নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় ৭০ ভাগই ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে। বর্তমান সময়ের দুর্ঘটনাগুলোও একই কারণে হচ্ছে।

লঞ্চের দৈর্ঘ, প্রস্থ, ড্রাফট ও উচ্চ এ চারটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে আনুপাতিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পৃক্ত। কিন্তু যদি যাত্রী ধারণ ক্ষমতা বড়ানোর জন্য খেয়াল খুশিমতো লঞ্চের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বাড়ানো হয় তখনই লঞ্চটি ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান:
নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর থেকে কোস্ট ট্রাস্টের প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৭৭ থেকে ২০১৪ সালের ১৫ মে পর্যন্ত দেশে ৪১৬টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানী ঘটছে ২০০৩ সালে। ওই বছর তিনটি নৌ দুর্ঘটনায় মারা গেছে ১ হাজার ১৫ জন। এছাড়া ২০১২ সালে তিনটি দুর্ঘটনায় ১৫০ ও ২০১৩ সালে ৩৯ জন। ২০০৯ সালে চারটি দুর্ঘটনায় ২৩২, ২০০৮ সালে তিনটি দুর্ঘটনায় ১১২, ২০০৭ সালে ১০টি দুর্ঘটনায় ৫০৩, ২০০২ সালে তিনটি দুর্ঘটনায় ৬০, ২০০১ সালে সাতটি দুর্ঘটনায় ৪০, ২০০০ সালে ছয়টি দুর্ঘটনায় ১০৪ এবং ১৯৯৯ সালে ২৯টি দুর্ঘটনায় ১০৪ জন মারা গেছে।

আইনের দুর্বলতা:
নৌ-পরিবহন সংক্রান্ত ১৯৭৬ সালের আইনে লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটলে মালিক, চালক ও জরিপকারীসহ অনেকের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থার কথা থাকলেও নকশাকারী বা নির্মাণকারীর বিষয়ে কিছুই নেই এ আইনে। এ জন্যই লঞ্চগুলোর নকশা নির্মাণ ও অনুমোদনে সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যায়।

লঞ্চ নির্মাণের বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে একটি নিয়ম রয়েছে। সে আনুযায়ী লঞ্চ নির্মাণ করা হলে সেটি ঝড় বা দুর্যোগের কবলে পড়ে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত কাত হলেও এতে পানি প্রবেশ করবে না। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশে নির্মিত লঞ্চগুলো মাত্র ১৫ থেকে ১৮ ডিগ্রি কাত হলেই এতে পানি ঢুকে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। আর এটি ঘটছে ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণেই।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য মতে, স্বাধীনতার পর দেশে নৌ-পরিবহন দুর্ঘটনায় ২০ হাজারের মতো মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২০০টির। তবে যে গুলো নিষ্পত্তি হয়েছে সেগুলোতেও কারোরই শাস্তি হয়নি। এতে করে মালিকরা সতর্ক না হয়ে আরো নিয়ম ভাঙে।

জানা গেছে, দেশে প্রায় ৩৫ হাজার নৌযানের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত নৌযানের সংখ্যা ১৩ হাজার। এর মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযান ২ হাজার ২২৫টি। তবে সবচেয়ে বড় হতাশার বিষয় হচ্ছে বিশাল এ নৌযানগুলোর চালকদের মধ্যে লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা মাত্র ১৫০।

যাত্রীবাহী নৌযানগুলোর মধ্যে বার্ষিক ফিটনেস পরীক্ষা বা সার্ভে করা হয় মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০টির। এ বিশাল নৌযানের সার্ভে করার জন্য রয়েছে মাত্র ৫ জন ইঞ্জিনিয়ার এবং শিপ সার্ভেয়ার। ফলে ফিটনেসবিহিনী লঞ্চগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

কোস্ট ট্রাস্টে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর থেকে দেয়া তথ্য মতে, ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ২৭২টি লঞ্চকে ফিটনেস পরীক্ষার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৮২টি লঞ্চ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কাগজপত্র জমা দেয়। এক হাজার ৩৫৪টি লঞ্চকে ত্রুটিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে এগুলোর রুট পারমিট বাতিলের সুপারিশ করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় সে সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।

চালকের অদক্ষতা:
কোস্ট ট্রাস্টের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লঞ্চ দুর্ঘটনার অরো একটি কারণ হচ্ছে চালকের গাফিলতি, অদক্ষতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। নৌ-নিরাপত্তার জন্য মাস্টার ও চুকানিদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও তা কেউ মানছে না। মাস্টারদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় এসব অত্যাবশ্যকীয় জ্ঞান যাচাই করা হয় না। এ কারণেই একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে।

সুপারিশ:
লঞ্চ দুর্ঘটনা রোধে রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বেশকিছু সুপারিশ জানিয়েছে কোস্ট ট্রাস্ট। সুপারিশগুলো হচ্ছে লঞ্চের নকশা প্রণয়নকারী ও ত্রুটিপূর্ণ নকশায় লঞ্চ নির্মাণকারীকে আইনের আওতায় আনা, দায়িত্বে অবহেলার জন্য কঠোর ব্যবস্থা, ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল বন্ধ করা, কোনো লঞ্চকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে সেই লঞ্চকে আটকে রাখার ক্ষমতা সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএকে দেয়া, নকশা প্রণয়ন পদ্ধতি জেলা-উপজেলা পর্যন্ত বিকেন্দ্রীকরণ করা, মেরিন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে পুলিশ ফোর্স মঞ্জুর করা, দুর্ঘটনায় নিহত আহত পরিবারকে মাথাপিছু ক্ষতিপূরণ দেয়া, লঞ্চ যাত্রীদের যাত্রার প্রাক্কালে তালিকা প্রণয়ন বাধ্যতামূলক করা, ঈদ-পূজার ছুটি ও কাল বৈশাখীর সময়ে লঞ্চঘাটে অতিরিক্ত পরিদর্শনকারী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ মোতায়েন করা।

এ বিষয়ে কোস্ট ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক মো. মুজিবুল হক মনির বলেন, ‘নকশায় দুর্বলতা ও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণেই দেশে একের পর এক নৌ-দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করা হলেও সরকার কোনো ব্যস্থা নিচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘লঞ্চের নকশা নির্মাণে অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করতে হবে। বহুবার যাচাই-বাছাই করা ছাড়া এগুলো অনুমোদন দেয়া যাবে না। কিন্তু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অনিয়মেই এমন কাণ্ড হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রয়েছে। যে কারণে কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছে না।’ নৌ-যানকে নিরাপদ রুট হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নৌযানে অনিয়ম, নকশায় ত্রুটিসহ সার্বিক বিষয়ে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে এখন কথা বলা যাবে না।’






মন্তব্য চালু নেই