মেইন ম্যেনু

মোদীর হিটলারি ফতোয়ায় ক্ষেপেছে শিক্ষামহল

শিক্ষক দিবসে প্রতিটি স্কুলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ শোনানোর ফতোয়ায় ক্ষুব্ধ রাজ্যের শিক্ষা মহল। কেউ বলেছেন, এটা হিটলারি সিদ্ধান্ত। কারও মতে, এটা ফ্যাসিবাদেরই নামান্তর। বিজেপি বাদে সব রাজনৈতিক দলই প্রধানমন্ত্রীর এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে রীতিমত তাজ্জব। রাজ্য সরকারের উদ্দেশে তাদের পরামর্শ, কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত কোনও মতেই যাতে কার্যকর করা না হয়, সেদিকে নজর রাখা উচিৎ। সেটা যে হবেও না, তার ইঙ্গিত দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ওই দিন নেতাজি ইনডোরে রাজ্য সরকার শিক্ষক দিবস পালন করবে। স্কুলগুলোতেও অনুষ্ঠান হবে। এর বাইরে আমাদের আর কোনও কর্মসূচি নিয়ে আগ্রহ নেই।

প্রাক্তন স্কুল শিক্ষামন্ত্রী ও সিপিএম নেতা কান্তি বিশ্বাস থেকে প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য প্রদীপ ভট্টাচার্য-প্রত্যেকেই শিক্ষক দিবসে দুপুর তিনটে থেকে পৌনে পাঁচটা শিক্ষার্থীদের স্কুলে রেখে টিভিতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনানোর উদ্যোগকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছেন। কান্তিবাবুর কথায়, কেন্দ্রের এই নির্দেশ কার্যকর করা হলে তা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমি মমতা বন্দোপাধ্যায়কে বলেছি, যাতে কোনও ভাবেই এমন ফ্যাসিবাদি সিদ্ধান্ত কার্যকর তিনি না করেন।প্রদীপবাবুর গলাতেও শোনা গিয়েছে একই সমালোচনা। তার বক্তব্য, নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু তিনি কোনও দিন শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ওইদিন ওর কথা কেন স্কুলে শোনানো হবে? এটা তো একেবারে হিটলারি কায়দা। প্রদীপবাবুর বক্তব্য, রাজ্য সরকার যাতে কোনও ভাবেই এমন ফতোয়ার ফাঁদে পা না-দেয়, সে আশাই রাখবো মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কাছে। আর ছাত্রছাত্রীদের বলব, এমন ফতোয়ার প্রতিবাদ করতে ওই সময় টিভি বন্ধ রাখা। আমি নিশ্চিত, এ রাজ্যের সিংহভাগ স্কুল পড়ুয়াই নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য শুনতে আগ্রহী নয়।

রাজ্যের স্কুলশিক্ষা দপ্তরের আরও এক প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ দে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, এই কর্মসূচি কোন ভাবেই এ রাজ্যে পালন করা উচিৎ নয়। শিক্ষক দিবসে স্কুল পড়ুয়ারা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনবে কেন? রাজ্যের দুই প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীই দাবি করেছেন, এখন যদি ‍ওই দপ্তর তাদের হাতে থাকত, তা হলে কেন্দ্রের এমন কর্মসূচি কার্যকর করা হত না। কান্তিবাবুর হুঙ্কার, আমি মন্ত্রী থাকলে এটা জান দিয়ে আটকাতাম। আর বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় প্রতি পার্থবাবুর পরামর্শ, প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে কেন্দ্রের এই নির্দেশের কড়া নিন্দা করুন। আমি শিক্ষামন্ত্রী থাকলে তাই করতাম। বর্ষীয়ান তৃণমূল সাংসদ তথা প্রাক্তন অধ্যাপক সৌগত রায়ের ভাষ্যমতে, এমন নির্দেশ অযৌক্তিক তো বটেই, এই ভাবে নিজেকে দেখানোর বা প্রচার করার মতো উদ্যোগ আজ পর্যন্ত ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন বলে আমি জানি না। এবিটিএ নেতা উৎপল রায় গোটা বিষয়টিকে চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস-এর একটি দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

শুধু প্রাক্তন মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতারাই নন, মানবসম্পদ উন্নয়নের মন্ত্রকের এহেন নির্দেশে হতবাক রাজ্যের শিক্ষামহলও। রাজ্য শিক্ষা কমিশনের সদস্য ও শিক্ষাবিদ অশোকেন্দু সেনগুপ্ত বলেন, এমন হাস্যকর উদ্যোগের ব্যাখ্যা একমাত্র সুকুমার রায়ই করতে পারতেন। তবে ভিন্ন সুর পাওয়া গিয়েছেশিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান সমীর ব্রহ্মচারীর কথায়। যদিও তিনি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে কোন বক্তব্য রাখেতে চাননি। বরং সিএসআইআরের প্রাক্তন ডিরেক্টর হিসেবে সমীরবাবুর বক্তব্য, আমি কোনও রাজনৈতিক বিতর্কে যেতে চাই না। তবে এর মাধ্যমে কোথায় প্রযুক্তি বা পরিকাঠামোর সমস্যা আছে সেটা জানা যাবে। এই সুবাদে বহু জায়গাতেই পরিকাঠামোর ব্যবস্থা হবে।

যে দেশের বহু স্কুলে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, শৌচাগার নেই, সে দেশে এমন করপোরেট সুলভ আইন-কানুনকে অগ্রাহ্য করে শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার আবার খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, আপনি বরং সব ভাষার সংবাদপত্রে আপনার বক্তব্য ছাপিয়ে দিন আর শিক্ষকদের বলেন সেটা পড়ে শোনাতে। তা হলেই তো মিটে যায়। এই বক্তব্যকে জনপ্রিয় যুক্তি বলে কটাক্ষ করে বিজেপি নেতা তথাহত রায়ের যুক্তি, এরপর তো বলা হবে, যে স্কুলে শিশুরা খেতে পায় না, সেখানে শৌচাগার কেন হবে?

স্কুল পরিচালকেরা কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট। তারা সমস্বরে বলেছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা বিলাসিতার সামিল। হেয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুনীল দাস ও হিন্দু স্কুলের প্রধান নারায়ণ দাসের বক্তব্য, ওই দিন স্কুলের অনুষ্ঠানেই ছাত্রছাত্রীরা ব্যস্ত থাকে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে হতবাক ওয়েস্ট বেঙ্গল খ্রিস্টান স্কুলসের সচিব মলয় ডি কোস্টা বলেন, ক্লাস ছাড়া ছাত্রছাত্রীদের এতক্ষণ স্কুলে বসিয়ে রাখা আদৌও সম্ভব নয়।






মন্তব্য চালু নেই