মেইন ম্যেনু

ব্র্যাকের চিলিং সেন্টারটি বন্ধ : দুগ্ধখামীদের চরম বিপাকে

হামিদা আক্তার : আমি প্রতিদিন এক থেকে দেড়’শ লিটার দুধ দেই ব্র্যাকের ডেইরি চিলিং সেন্টারে। দীর্ঘদিন ধরে তিলে তিলে গড়ে তুলেছি এই ডেইরী ফার্মটি। অনেক কষ্ট, জীবনের সাথে লডাই করে গড়ে তুলেছি একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম ডেইরী ফার্মটি। কেবল মাত্র সুখের ছোয়া লাগতে শুরু করেছে আমাদের জীবনে। কিন্তু সুখের মুখ হয়ত আর দেখা মিলবে না। এভাবেই নিজের জীবনের কথা তুলে ধরছিলো ডিমলা সদরে দ:তিতপাড়া (মেডিকেল মোড়) গ্রামের আজিজুল ইসলাম ডেইরি ফার্মের মালিক টকবকে যুবক খামারী সুমন ইসলাম (২৫)। বাবার সাথে ফার্মে কাজ করে যা উপার্জন হয় তাই দিয়ে আমাদের সংসারে দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের নিশ্চয়তা ছিলো। ২৫ জানুয়ারী-১৭ থেকে ডিমলা ব্র্যাকের ডেইরি চিলিং সেন্টারটি উঠে যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সেন্টারটি। এখন ফার্মের এত দুধ দিবো কোথায়? কি হবে ফার্মের? কিভাবে চলবে ফার্মটি। এসব নানা চিন্তায় এখন আর ঘুম আসে না। অনেক সাধনার ফার্মটি বুঝি আর রক্ষা করতে পারবো না। যখন এসব কথা প্রতিবেদককে বলছিলো সুমন তখন চোখে মুখে যেন অজানা এক কালো ছায়া তাকে ঘিরে রেখেছে। সরজমিনে বেশ কিছু ডেইরি ফার্ম ঘুরে দেখা গলে খামারীদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে ফার্মের দুধ হবে কি ? কোথায় হবে বিক্রি। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সদরে কথা হয় ডেইরি ফার্মের মালিক নরুল আমিন, হবিবর রহমান, নজরুল ইসলাম ও আজিজুল ইসলামের সাথে। তারা জানান, নজরুল ইসলামের ফার্মে ১৬টি গরু রয়েছে প্রতিদিন দুধ হয় প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লিটার, নরুল আমিনের ২৬ টি গরু দুধ দেয় ৮০ থেকে ১’শ লিটার, হাবিবুর রহমান ফার্মে ১০টি গরু দুধ হয় ৫০ থেকে ৬০ লিটার ও আজিজুল ইসলাম ফার্মে গরুর সংখ্যা দৈনিক প্রায় ৯০ থেকে ১’শ লিটার দুধ হয়। এসব খামার মালিকেরা বলেন, আমরা প্রত্যেকেই ব্র্যাক ব্যাংকের কাছে ৩ লাখ থেকে শুরু সর্বোচ্চ ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋন নিয়ে এসব খামার পরিচালনা করছি। নিয়মিত দুধ বিক্রি করেই এসব ঋনের পাকা পরিশোধ করছি। এখন যদি দুধে দাম না পাই এবং দুধ বিক্রি করতে না পারি তাহলে ঋনের কিস্তির পাকা কিভাবে শোধ করবো। উপজেলার ডেইরি খামারগুলোর খোজ খবর নিয়ে জানা গেছে, উপজেলাটিতে ছোট-বড় ১৪০টি দেশী ও বিদেশী জাতের গরুর খামার গড়ে উঠেছে। তারা সকলেই তাদের খামারের উৎপাদনের কথা জানান। তারা সকলেই বলেন, বেসরকারীভাবে ঋণের মাধ্যমে গাভী পালনে পরিবার ভিক্তিক আমরা সকলে খামার গড়ে তুলেছি। এতে অনেকখানি স্বাবলম্বী হয়েও উঠেছি। এখন প্রচুর দুধ উৎপাদন করছি। কিন্তু এখন উৎপাদিত গাভীর দুধ বাজারজাত করতে হিমসিমে পড়তে হবে। এতদিন ব্র্যাক চিলিং সেন্টারে দুধ দিয়েছি। সেন্টার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । এখন কি হবে ? উক্ত সেন্টারে গড়ে প্রতিদিন এ উপজেলা থেকে প্রায় ৫ থেকে ৭’শ লিটার দুধ দেওয়া হত। আরো প্রায় ৫’শ লিটার দুধ বিভিন্ন চা দোকানে, মিষ্টি দোকানে বাসা বাড়ীতে সরবরাহ করতো খামারীরা । কিন্তু এখন তো চিলিং সেন্টারটি বন্ধের পথে তাহলে এত দুধ কোথায় সরবরাহ করা হবে। তাছাড়া আমরা চিলিং সেন্টারে দুধ ৪৬ টাকা দরে প্রতিলিটার দুধ বিক্রি করতাম। সেন্টারের বাইরে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ টাকা দুধ বিক্রি করতে হবে। খামারে থাকা গরুর খাবার ক্রয়ে হিমসিমে পড়তে হবে খামারীদের। এতে গাভী পালনের খরচ উঠবে না তাদের। নিরুপায় হয়ে খামার বন্ধের দিকে চিন্তা ভাবনা করতে হচ্ছে খামারীদের। এছাড়াও এত বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত দুধ বিক্রি করতে না পারলে হয়ত অসংখ্য দুধ নষ্ট হয়ে যাবে তখন ফেলে দেওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। তারা জানায় ডিমলায় সরকারী কোন দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র (চিলিং পয়েন্ট) না থাকার কারণে দুধের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা। একটি মাত্র বে-সরকারী চিলিং সেন্টার থাকলেও তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। উপজেলা প্রাণী সম্পদের এক হিসাব অনুসারে দেখা যায় ডিমলায় গবাদি পশুর সংখ্যা এক লাখ ১২ হাজার ৩৫০টি। দৈনিক দুধ উৎপাদন হচ্ছে পনেরো হাজার ২০০ লিটার। বর্তমানে প্রতি লিটার দুধ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। খামারী পরিবারগুলো নিজেদের স্বাবলম্বী গড়ে তুলতে পরিবারভিত্তিক ছোট-বড় অসংখ্য দুগ্ধখামার গড়ে তুলেছে। প্রতিটি পরিবারই হয়ে উঠেছে যেন একেকটি দুগ্ধখামার। আর এ দুধই তাদের স্বপ্ন, তাদের জীবন। রোজীর এক মাত্র অবলম্বন। কিন্তু দুগ্ধ উৎপাদনকারী গাভী পালনকারী পরিবারগুলো প্রায় ৫ সহ¯্রাধিক সদস্য এখন চরম বিপাকে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্গা করছে তারা। প্রতিদিন বিপুল পরিমান দুধ উৎপাদন হলেও তা বিক্রি এবং ন্যায্যমূল্য হতে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। এখানে দুগ্ধ শীতলীকরণ (চিলিং পয়েন্ট) কেন্দ্র না থাকার ফলে দুগ্ধখামারিরা গাভী পালনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। প্রতিদিন উৎপাদিত দুধ সময় মতো বিক্রি না হওয়ায় অনেক দুধ নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কথা হয় উপজেলা প্রাণ কেন্দ্র অবস্থিত ব্র্যাকের ডেইরি চিলিং সেন্টারের ইনচার্জ মিঠুন রায়ের সাথে তিনি বলেন, ২০০১ সাথে সেন্টারটি স্থাপন করে দীর্ঘ ১৬ বছর চালু থাকলো। কিন্তু চাহিদা মত দুধ কালেকশন করা সম্ভব হয়নি। আগামীকাল ( বুধবার) ২৫ জানুয়ারী/১৭ থেকে এই চিলিং সেন্টারটি স্থানান্তারিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার শিংঙ্গের ডাবরী হাট সংলগ্ন স্থানে স্থাপন করা হবে। ডেইরি চিলিং সেন্টারটি কেন উঠে যাচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাাদের চাহিদা মোতাবেক দুধ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এখানে ঘাটতি পড়ছে। চাহিদা প্রতিদিন ২ হাজার লিটার কিন্তু দুধ সংগ্রহ হয় গড়ে প্রতিদিন মাত্র ৪ থেকে ৫’শ লিটার। তাহলে কিভাবে সেন্টারটি এখানে থাকবে বলেন ? এ বিষয়ে কথা হলে ডিমলা উপজেলার পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্পের সমন্বয়কারী পুরান চন্দ্র বর্মনের জানান, বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্প ডিমলা উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের খামারিদের জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। খামারিরা যেন দুধের ন্যায্যমূল্য পায় এবং সরকারের সুযোগ-সুবিধাগুলো নিতে পারে এজন্য গত বছরের ২৯ অক্টোবর মিল্কভিটা লিমিটেডের রংপুর চিলিং পয়েন্টের সিনিয়র ব্যবস্থাপক ডাঃ শ্যামল কুমার রায়ের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল ডিমলা উপজেলা পরিদর্শন করেন। তারা সকলে এখানে সরকারী উদ্যোগে একটি চিলিং পয়েন্ট স্থাপন করতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ মালা প্রেরণ করেন। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে যেহেতু ৭০ ভাগ শিশু খাদ্য বিশেষ করে দুধ বাইরের দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সেহেতু এখানকার খামারিদের যদি উৎসাহ-উদ্দীপনা দেয়া যায় তাহলে দুধের জন্য সম্ভাবনাময় একটি এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।






মন্তব্য চালু নেই