মেইন ম্যেনু

এই শহরের জীবন্ত কবি

বাংলাদেশে পপুলার কালচারের পপ-কবি আজিজুর রহমান আজিজ

কবি ও উপন্যাসিক আজিজুর রহমান আজিজ প্রায় ১৮০০ কবিতা লিখেছেন। তার লিখা উপন্যাসের সংখ্যা ৩০টি, গানের সংখ্যা প্রায় ১০০০টি, এছাড়া তিনি অনেক গল্প, শিশুতোষ, টিভি সিরিয়াল, নাটক লিখেছেন এবং তার উপন্যাস অবলম্বনে বাংলা চলচ্চিত্র নির্মান হয়েছে।

পেশাগত জীবনে এম. আজিজুর রহমান বাংলাদেশ সরকারের একজন অবসর প্রাপ্ত সচিব এবং সর্ব শেষ তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধান তথ্য কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তার কলমী নাম আজিজুর রহমান আজিজ, এই নামে তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাসহ লেখালেখি করে আসছেন।

আজিজুর রহমান আজিজের জন্ম ১৯৪৪ সালের ১০ই জানুয়ারী, বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার (বর্তমানে মাদারীপুর জেলা), মাদারীপুর সদর থানার ধুরাইল ইউনিয়নের ইটখোলা বাজিতপুর গ্রামে। তার পিতা আবদুল মান্নান ১৯৪৭ পূর্বকালে কোলকাতা পোর্টে সহকারী পোর্ট কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবরর্তীতে একজন মর্মবাদি ও আধ্যাত্মিক সাধক হিসাবে পরিচিত লাভ করেন।

শৈশব থেকেই সে পিতার কাছ থেকে গভীর জীবন বোধ, পরোহিতৈষী, মানব প্রেম, জীব প্রেম সমাজ সচেতনতা প্রভৃতি গুনাবলি অনুসরন করে দীক্ষা লাভ করে। ফলশ্রুতিতে তার শৈশবের এই জীবনবোধ এবং শিক্ষা তাকে শৈশব থেকেই লেখা-লেখির জগতে টেনে নিয়ে যায় এবং তাই সে শৈশব থেকেই একটু-একটু করে লিখতে শুরু করেন।

তার লেখায় বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতি-ঐতিহ্য (পপুলার কালচার)এসব প্রকাশের নিজস্ব ভংগিমা, কৌশল এবং ভিন্ন বলয় ফুটে উঠে, যে কারনে পরবর্তীতে তার লেখালেখির ভুবন অনেক বড় জগত ও সীমানায় বিস্তৃত হয়েছে। শৈশবে তিনি লিখেছেন ছড়া ও কবিতা এবং ধীরে ধীরে তিনি গান, কবিতা, উপন্যাস, গল্প ও নাটক লিখতে শুরু করেন যা এখনো অব্যাহত রেখেছেন।

একজন গীতিকার ও সুরকার হিসেবে রবীন্দ্র সংগীতের প্রতি তার আছে প্রবল আকর্ষন এবং ভাললাগা ও ভালবাসা, যে কারনে তিনি রবীন্দ্র সংগীত চর্চা করেছেন এবং গীটারে প্রশিক্ষন নেন যা তাকে আজকের সফল একজন গীতিকার ও সুরকার হিসেবে তৈরী হতে সহযোগিতা করে।

বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) আজিজুর রহমান আজিজের লেখা গান, নাটিকা দীর্ঘকাল ধরে সম্প্রচারিত করে আসছে। বিটিভিতে মধুছন্দা, মালঞ্চ, কথাও সূর, সূর ও বাণী শিরোনামের গানের অনুষ্ঠানসমুহ অনেক জনপ্রিয় ও দর্শক সমাদৃত, এছাড়াও তাঁর লেখা নাটক- মাধূরী ও অন্যান্য, জীবন জীবনের জন্য উল্লেখযোগ্য।

আজিজুর রহমান আজিজ মাদারীপুরের কালামৃধা জিও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক্যুলেশন পাশ করেন এবং সরকারী রাজেন্দ্র কলেজ থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি মাদারীপুরের খাজা নাজিমউদ্দিন কলেজে পড়াশোনা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উপরে স্নাতোকত্তোর ডিগ্রি লাভ করেন। এর কিছু বছর পরে তিনি যুক্তরাজ্যের কুইন ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় অফ ম্যানচেস্টারে পড়াশোনা করতে যান।

আজিজুর রহমান আজিজের শিল্প-সাহিত্য কর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রকাশনার সংক্ষিপ্ত বর্ননা দেয়া হলো:-

উপন্যাস: আজিজুর রহমান আজিজের লিখা উপন্যাসের সংখ্যা ৩০টি। তার উপন্যাস অবলম্বনে বাংলা চলচ্চিত্র নির্মান হয়েছে। তার উপন্যাসে আবহমান বাংলার কৃষ্টি-কালচার, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম-ভালবাসা এবং আধ্যাত্মিকতার বিষয়সমুহ উঠে এসেছে এবং সেইসাথে মানবধ্যানের অনেক ত্বত্তকথা এবং জীবন-জীবিকার বাস্তববাদী অভিজ্ঞতাসমুহ। তার প্রকাশিত উপন্যাসসমুহ হচ্ছে; বিনষ্ঠ প্রেম, সুদূরের রঙধনু, দূর থেকে দূরে , সত্য সুন্দর আনন্দ, কারাগার কারাবাস, অন্য প্রজাপতি, অনিতা, বিপন্ন বাসর, আহত প্রেম, মাধুরী এবং অন্যান, কালো যদি মন্দ তবে, পাথরের কান্না, যখন আন্দামানে, চন্দন কাঁঠের সিঁড়ি, জীবন ও হৃদয়কাব্য, বসন্ত কাঁদে, মধ্য রাতের সংলাপ, শহরতলীর কাব্য, দহণ ক্ষরণ অন্তরে বাইরে, অপারেশন থিয়েটারে চারঘন্টা, দয়িতা, কাক ও মানুষেরা, নীল গোলাপ, যে জীবন ফেরারী, ইমা এবং দুটি চিঠি, নিশি।

কাব্যগ্রন্থ: কবি কবি ও উপন্যাসিক আজিজুর রহমান আজিজ প্রায় ১৮০০ কবিতা লিখেছেন। তিনি তার প্রজম্ন এবং বন্ধু, অণুসারী ও পরিচিত সম্প্রদায়ের মাঝে “এই শহরের জীবন্ত কবি”নামেই পরিচিত। তাকে পপুলার কালচারের পপ-কবি বলা হয়। তার কবিতার বিষয়সমুহ হচ্ছে গ্রামীণ ও শহুরে জীবন, নারী, মুক্তিযুদ্ধ, শাহবাগ আন্দোলন, প্রেম-ভালবাসা, ইতিহাস, এবং প্রজম্নের পদাবলী। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হচ্ছে; তোমাকে ঘিরে, বিষন্ন সংলাপ, বিরতিহীন অর্কিড, নিরন্তর অন্তরে, এখন কারো না কারো কিছু বলা উচিত, হেড লাইনের সংবাদ, তবুও বেঁচে আছি, এই প্রেম অনন্ত বিরহ (তিন খন্ডে), জীবনের গল্প, তোমাকে তো কিছু বলিনি, অনন্ত নগরে যাবো (তিন খন্ড), হৃদয়কে করি খন্ড খন্ড, কষ্ট জলে হৃদয় সমূদ্দূর, এবং তুমি-, শিরোনামহীন কিছু অকবিতা (ইংরেজি অনুবাদসহ), প্রজন্মের পদাবলী, জলে ও জীবন জলে, তখনো রাত এখনো আধাঁর, এই প্রেম অন্তর বিরহ, এই প্রেম অন্তর বিরহ (দ্বিতীয় খন্ড), নির্জন নিঝুম ছায়ায়, নির্বাচিত প্রেমের কবিতা।

গল্পগ্রন্থ ও শিশুতোষ: আজিজুর রহমান আজিজ বেশকিছু গল্প এবং অসংখ্য শিশুতোষ লেখা লিখেছেন। তার গল্পগ্রন্থ হচ্ছে “অরণ্যে পাপ” এবং শিশুতোষসমুহ হচ্ছে; অচিন দেশের অচিন পাখি, মিথ্যে রাজার দেশে, দরবেশ পাখি, পরীর রাজ্য করলো যারা জয়, আকাশ অনন্ত অহনার ছড়া, এসো স্বাধীনতার গল্পবলি, মামা কাহিনী, কোন এক রাজ কন্যার কথা।

নাটক ও সিনেমা: বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচারিত আজিজুর রহমান আজিজের নাটকসমুহ হচ্ছে; মাধুরী এবং অন্যান্য (উপন্যাস অবলম্বনে)= বিটিভি/ইটিভি; পান্থ পাদব-বিটিভি; ধারাবাহিক নাটিকা; জীবনের আঙ্গিনায় -১৯৯৬-১৯৯৮ বিটিভি; সুখের ঠিকানা -১৯৯৬-১৯৯৮ বাংলাদেশ বেতার; এছাড়াও জলের মেয়ে- ইউনিভার্সিটি ফ্লিল্মস পূর্ন দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রেম শুধু প্রেম- লেখকের অন্য প্রজাপতি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন ইউনিভার্সিটি ফিল্মস লিঃ।

সম্মাননা এবং পুরস্কার সমূহ: আজিজুর রহমান আজিজ বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। তার পুরস্কার ও সম্মাননাসমুহ হচ্ছে; স্বনির্ভর ব্রোঞ্জ মেডেল, ভলার্ন্টিয়ার মাচপার্টিসিপেশন স্বর্নপদক, রেনেসো সাংস্কৃতি সংস্থা পদক, ত্রি-তরঙ্গ সাহিত্য পদক, মাইকেল মধুসুদন পদক, ঋষিজি সাহিত্য পদক, পালক সাহিত্য পদক, কালা ধ্বনী সাহিত্য পদক, শের-ই- বাংলা সাহিত্য পদক, যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে বিব্ল্ওিগ্রাফি সেন্টারে-ম্যান অফ দ্যা ইয়ার।

চাকুরী ও অন্যান্য দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র: চাকরী জীবনে আজিজুর রহমান আজিজ বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলা(মহকুমা)র প্রসাশক ছিলেন, সরকারের সচিব, বাংলাদেশের প্রথম প্রধান তথ্যকমিশনার (প্রতি মন্ত্রীর পদমর্যাদায়) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন, বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অফ গর্ভণসের গর্ভণর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন, বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অফ ট্রাষ্টিজের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন, এছাড়া বেসকারীভাবে প্রতিষ্ঠিত রবীন্দ্র একাডেমির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। আজিজুর রহমান আজিজ অন্যান্য যে সব বিষয় ও পদে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে এবং সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, তার সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া: সভাপতি, রবীন্দ্র একাডেমী। সভাপতি, জাতীয় জাদুঘর বোর্ড অব ট্রাস্টিজ; সভাপতি, ইসি বাংলাদেশ; উপদেষ্টা ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা সভাপ্রতি, ত্রিরঙ্গ চট্রগ্রাম; জীবনসদস্য, বাংলা একাডেমী; সহ-সভাপতি, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় বাংলা এ্যালামনাই; জীবনসদস্য, বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা চাকুর জীবি সমিতি, ঢাকা; বাংলাদেশের প্রথম প্রধান তথ্য কমিশনার (প্রতিমন্ত্রীপদমর্যাদায়); প্রতিষ্ঠাতা স্বত্ত্বাধিকারী অনলাইন নিউজ প্রোর্টাল সময়ের কন্ঠস্বর.কম ।

বিদেশ ভ্রমন: সম্মেলন (ইউনিসেফ আয়োজিত), ভারত; মার্ড প্রশিক্ষন, তুরস্ক; কর্মশালা (এইচআইভি/এইডস), থাইল্যান্ড; শিক্ষা সফর (পরিবার পরিকল্পনা), ইন্দোনেশিয়া; শিক্ষা সফর, যুক্তরাজ্য; আলোচনা সভা/কর্মশালা (হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা অভিজ্ঞতা), থাইল্যান্ড; সম্মেলন (সাসাকাওয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত), ভিয়েতনাম; সম্মেলন, ভারত; জাতীয় ও আন্তজার্তিক পুষ্টি বিষয়ে প্রশিক্ষন কর্মশালা, নেদারল্যান্ড; সম্মেলন, সুইজারল্যান্ড; সম্মেলন, ব্রাসেলস; (আগাখান মেডিকেলবিশ^বিদ্যালয়-করাচী সম্মেলন, পাকিস্তান; বিশ^ ব্যাংকের সাথে লন্ডন, বিআইএনপিএর ঋণ চুক্তি আলোচনা, যুক্তরাষ্ট্র; শিক্ষা সফর, যুক্তরাজ্য; শিক্ষা সফর প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত, মালয়েশিয়া; অফিসিয়াল সম্মেলন এইচআইভি-এইডস, স্পন্সর ডডব্লিউ এইচও, ভারত; (এডেনবার্গ) নার্সিং বিষয়ে সম্মেলন, যুক্তরাজ্য; শিক্ষা সফর ও সার্ক সম্মেলনের আওতাধীন স্বাস্থ্য বিষয়ক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, শ্রীলংকা; এইচআইভি-এইডস সম্মেলন, (এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক), জাপান; শিক্ষা সফর-সিভিল প্রশাসন কার্যক্রম বিষয়ক, সিঙ্গাপুর; শিক্ষাসফর-মালয়েশিয়া সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে উচ্চতর ধারনা, মালয়েশিয়া; সাধারণ ও শিক্ষা সফর, সুইডেন; সাধারণ ও শিক্ষা সফর, তুরস্ক; সাধারন ও ট্রাফি কিং বিষয়ক এইচআইভি এইডস প্রতিকার বিষয়ক সফর ও মাদকদ্রব্য, থাইল্যান্ড।

কবি আজিজুর রহমান আজিজ মাতৃভাষা বাংলাসহ ইংরেজি, উর্দু এবং আরবী ভাষাতেও পারদর্শী। তিনি প্রায় ১০০০টি গান লিখেছেন, অসংখ্যগানে সুর দিয়েছেন এবং নিজের কন্ঠেও অনেক গান গেয়েছেন।

১৯৭১ সালে তিনি মহেশপুর-যশোরে ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন এবং ১৯৭১ সালের ১০ই মার্চ মহেশপুরে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করণে অগ্রনী ভুমিকা রাখেন।


নিবন্ধ: বাংলাদেশে পপুলার কালচারের পপ-কবি আজিজুর রহমান আজিজ। লেখক: রাঈখ হাতাশি, দক্ষিন এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি, মর্ডান ঘানা মিডিয়া গ্রুপ। তথ্যসুত্র: বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জাতীয় জাদুঘর, তথ্য কমিশন, এবং কবি আজিজুর রহমান আজিজের সাক্ষাৎকার।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই