মেইন ম্যেনু

বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়

গোলাম রাব্বী: আমরা সবাই দেখি রাস্তার আশপাশের দেয়াল, পিলার আবার কখনো কখনো রিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনে নানা ধরনের  পোস্টার, ব্যানার আর স্লোগান। নানা সময়ে, নানা উপলক্ষে, নানা উদ্দেশ্যে, নানা কারণে-অকারণে সাঁটানো হয় এসব কিছু। আর এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পোস্টারই বেশি ছেয়ে থাকতে দেখা যায় আমাদের চারপাশ।

ঈদের সময়, নির্বাচন আর উৎসব-পার্বণে শুভেচ্ছা জানাতেই পোস্টার বা ব্যানার ব্যবহার করতে দেখা যায় বেশি। কিন্তু আমরা একটু খেয়াল করলে দেখব আগস্ট মাস এলেই শোক দিবসের পোস্টারে ছেয়ে যায় আমাদের চারপাশ। এটা দোষের কিছু নয়। বরং আমি এটাকে শ্রদ্ধার চোখেই দেখি। একটি দেশের স্বাধীনতার মূলস্তম্ভ জাতিরজনককে সবাই মিলে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করবে এটাই স্বভাবিক।

কিন্তু প্রশ্নটা আমার মাথায় অন্যভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে বহুদিন ধরে। আর এই আগস্ট মাস এলে আরো বেশি ঘোরে। যেমন এই মাসে জাতিরজনককে স্মরণ করার নামে মনে হয় অনেক নেতা যাদের নাম বা পরশ সহসা কেউ পাননি এমনকি ওই দলের নেতারাও চেনেন না, তারা শুধু নিজেকে স্মরণ করাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন সৌজন্য প্রকাশের নামে।

এটা যে শুধু জাতিরজনকের বেলায় আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিকরাই করেন তা কিন্তু নয়। আপনি দেখবেন সব দলের রাজনীতিবিদই তাদের দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীসহ বিভিন্ন আয়োজনে তার দলের পূর্বপুরুষকে বা বর্তমান সভাপতি অথবা চেয়ারপারসনকে ব্যবহার করে দেদারছে প্রচার করছে নিজেকেই। সেটা নির্বাচনী উপলক্ষ বা রাজনৈতিক কোনো কাজে ব্যবহার হলে কথা নেই বা ওই দলের স্বার্থ রক্ষার্থে হলেও কোনো কথা বা প্রশ্ন নেই আমার। সেটা দেশের যে দলেরই হোক কিন্তু যেটা জাতীয় শোক, সেদিন তাঁকে স্মরণ করার নামে সাম্রাজ্যবাদী এমন আচরণের মাধ্যমে নিজেকে প্রচার করা কতটা যৌক্তিক?

এই প্রশ্ন এতদিন কেবল আমার মাথাতেই ঘুরপাক খেয়েছে বিধায় লিখতে পারিনি। এবার সাহস পেলাম। কেননা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন স্বয়ং এক রাজনীতিবিদই। তাও আবার একটি দলের সিনিয়র এক নেতা। তিনি আর কেউ নন বর্তমান সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ওবায়দুল কাদের। তিনি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী নিয়ে কথা বলতে এসেছিলেন প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আয়োজনে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কর্তৃক জাতিরজনককে স্মরণের একটি প্রোগ্রাম। এ অনুষ্ঠানে জাতিরজনককে স্মরণ করার নিমিত্তে সভায় যোগ দিয়ে মন্ত্রী যেন আমার মনের কথাগুলোই বলতে শুরু করলেন। তিনি যেমন বলছিলেন, তার মূল বক্তব্যটা ছিল ঠিক এ রকমÑ‘আমরা অনেকেই আজ জাতিরজনককে বিক্রি করছি। তাঁর পোস্টার ছাপিয়ে মূলত নিজেদের সম্মানকে বাড়ানোর চেয়ে বরং বঙ্গবন্ধুকে ছোট করে পুরো আওয়ামী লীগকেই বিক্রি করছি।’

এরপর তিনি শুরু করলেন আরো কঠোর কথা। যেমন তিনি এর পরপরই বললেন, ‘দেখুন এ মাস এলেই সৌজন্য পোস্টারে চারপাশ ছেয়ে যায়। আর পোস্টারগুলোতে এমনভাবে বঙ্গবন্ধুকে দেয়া হয় তার পাশেই সৌজন্যে যিনি দিয়ে থাকেন তিনি বা তার ছবিকেই বড় করে দেখান। হায়রে বঙ্গবন্ধু-প্রীতি। মনে হয় জাতির জনককে নয়, নিজেকেই স্মরণ আর প্রচারে নেমেছেন।’ তিনি এও বুঝাতে চেয়েছেন যে, এমন প্রচার-প্রচারণা যে কেবল বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই হয় তা কিন্তু নয়; ঠিক জিয়া-খালেদা-হাসিনা, তারেক-কোকো আর জয়ের বেলায়ও এমনটি ঘটছে।

এখানেই থামেননি তিনি। বলেছেন পোস্টারে লেখা কথা নিয়েও। বলেন, ‘জাতীয় শোক দিবস’Ñএ কথাটুকু যেমন লেখা হয়, তার চেয়েও বড় করে লেখা হয় ‘সৌজন্যকারী ব্যক্তির নামটিকে।’ তিনি প্রশ্ন তোলেনÑ ‘এটা কি যৌক্তিক?’ আমরা কি একটু চিন্তা করছিÑ‘এতে জাতিরজনককে বাদ দিয়ে নিজেকেই বরং বড় করে দেখাতে চাচ্ছি, যেটা সৌজন্যতা প্রকাশ না করে বরং অসৌজন্যতাকেই প্রকাশ করছে। তাই নয় কি?’

তিনি আরো বলেন, ‘এমনভাবে আমরা আজ পোস্টার-ব্যানার আর স্লোগান দিচ্ছি তাতে সভাস্থলে গেলে মনে হয়,  ‘ভাইয়ের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনা বা খালেদাকে শুভেচ্ছা।’ তারপর বলা হয়ে থাকে ‘শুধু ভাইয়ের নামই।’ তখন বড় নেতা আর নেত্রীর নামের চেয়ে যে নেতা ওই অনুষ্ঠানে নিয়ে আসেন তার সাগরিদদের; মঞ্চের পাশে বসে তারা তাকে প্রচার আর প্রসারের জন্যই স্লোগান দিতে থাকে। এটা আমাদের মতো সব সিনিয়র নেতার জন্য বিব্রতকর বলেও মনে করি ।

আমারও ঠিক তাই মনে হয়। আমি মনে করি যোগাযোগমন্ত্রী যৌক্তিক কথা বলেছেন। কেননা হাসিনা আর খালেদা যেই হোক, আমি যদি তাদের কোনো সফলতাকে প্রকাশ করতে গিয়ে সৌজন্য বা সহযোগিতা উল্লেখ করি, তাকে ছাপিয়ে নিজের নামটিকে, ছবিটিকেই বড় করে পোস্টার ছাপাই; তাহলে সৌজন্যতাটা থাকল কই?

সবশেষে বলি, ভাই আপনি যদি নিজেকে প্রচার আর প্রসার করতেই চান তাহলে যাঁকে স্মরণ করে বা যাঁকে সম্মান দিয়ে সৌজন্য প্রকাশ করতে চান, সেটা যেন ছাপিয়ে না যায়। নইলে মনে হবে ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়।’

লেখক : সংবাদ উপস্থাপক ও নিউজরুম এডিটর, সময় টেলিভিশন






মন্তব্য চালু নেই