মেইন ম্যেনু

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও ধূমপান করেছেন মহসিন আলী!

প্রকাশ্যে ধূমপান জায়েজ করতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও অপমানিত করেছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। সম্প্রতি জেলার রাজনগর উপজেলা চত্বরে তাকে দেয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সরকারের এই মন্ত্রী জানান, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও তিনি ধূমপান করেছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে নতুন এই তথ্য প্রচারে নেমেছেন তিনি। সিলেটে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসেই প্রকাশ্যে সিগারেট টেনে আলোচিত-সমালোচিত তৃণমূল আওয়ামী লীগের এই নেতার এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যে হতবাক মৌলভীবাজারবাসী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রবাসী ও চা বাগানঅধ্যুষিত সিলেটসহ মৌলভীবাজারে সভার মঞ্চে বসেই প্রকাশ্যে ধূমপান করে ব্যাপক সমালোচিত সৈয়দ মহসিন আলী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই আওয়ামী লীগ নেতা এলাকায় বেশ জনপ্রিয় হলেও বর্তমানে তার ব্যক্তিগত আচার-আচরণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কাছে সমালোচনার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পরই তাকে দেয়া বিভিন্ন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে লাগামহীন মন্তব্য করতে শুরু করেন। এমনকি বিএনপি ও দলীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে উদ্দেশ করে অশ্লীল ভাষায় বিষোদগার করে নিজ দলেই অজনপ্রিয় হয়ে পড়েন তিনি। ধূমপান ও মিথ্যা কথা বলা যেন তার নেশায় পরিণত হয়েছে- মন্তব্য তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি রাজনগরে সমাজকল্যাণমন্ত্রীকে দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের একটি ভিডিও ফুটেজ যুগান্তরের কাছে সংরক্ষিত আছে। ফুটেজে দেখা যায়, মন্ত্রী মহসিন আলী উপস্থিত জনতার উদ্দেশে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বলছেন, ‘সাংবাদিক ভাইয়েরা সাংবাদিকতা করছেন, আপনাদের আর কোনো কাজ নেই? খালেদা জিয়া-তারেক রহমান কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন সেদিকে আপনাদের খেয়াল নেই। তাতে কোনো দোষও নেই। সব দোষ হল মহসিন আলীর, সিগারেট খায়।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘গত সোমবার (১১ ফেব্রুয়ারির আগে) মন্ত্রিসভার বৈঠকে আমার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, মহসিন ভাই সিগারেট একটু কম খেলে হয় না? এ সময় আমি কিছু বলতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আরে আপনি কি বলবেন। যা বলে দিয়েছি সেটা করবেন। মহসিন আলীর এ বক্তব্যের সময় ডায়েসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাজনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সল আহমদ মন্ত্রী মহসিন আলীকে কানে কানে বলতে দেখা যায়, ‘আপনি যে বঙ্গবন্ধুর সামনে সিগারেট খেয়েছেন তাও বলে দেন।’ তার এ কথার পর প্রকাশ্য ধূমপানের বিষয়ে মহসিন আলী অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলেন, মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীই বলেছেন, ‘মহসিন ভাই সেই ২৭ বছর বয়স থেকে আমার বাবার সামনেই সিগারেট খেয়েছেন!’ উনি আমার বাবার পাইপেও ভরে দিতেন, উনি নিজেও খেতেন।’ মহসিন আলী এ কথা বলার পর সভাস্থলে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি প্রবীণ বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ক্ষোভও প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিছবাউদ্দোজা ভেলাই যুগান্তরকে বলেন, মহসিন আলী কত বড় বেয়াদব তা রাজনগরবাসী নিজ কানে শুনেছেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে সিগারেট খাওয়ার কথা বলে উপস্থিত জনতাকে তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন? এ কথা বলে নিজেকে বিখ্যাত করার অপকৌশল নিলেও বঙ্গবন্ধুকে তিনি অপমানিত করেছেন। এত বড় বেয়াদবকে প্রধানমন্ত্রী কিভাবে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিলেন। এই এলাকায় কী কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নেই। তারা এই ম্যাসেজ প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠাচ্ছেন না?

এদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সল আহমদ যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রী সংবর্ধনা সভায় যা বলেছেন সেটা তিনি নিজের ইচ্ছায় বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সিগারেট খাওয়ার কথা বক্তৃতায় বলার জন্য মন্ত্রীকে তিনি বলেননি। তিনি শুধু সভা পরিচালনা করেছিলেন। মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নেছার আহমদ যুগান্তরকে বলেন, তিনি ওই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ছিলেন না। মহসিন আলী যদি বলে থাকেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সিগারেট খেয়েছেন তাহলে তার এই উক্তি কুরুচিপূর্ণ এবং অসুন্দর।

কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সিলেট বিভাগের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিজবাহ উদ্দিন সিরাজ। সোমবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না।

১৯৮৪ সাল থেকে টানা তিনবার পৌর নির্বাচনে বিজয়ী এবং মহসিন আলীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন ওয়ার্ড কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, মিথ্যা কথা বলার প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা দিয়ে ওই কমিশনার বলেন, পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন একবার সচিবালয়ে বিশেষ প্রয়োজনে তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদের কাছে যান মহসিন আলী। তিনি মৌলভীবাজারের কথা শুনে আমেরিকাপ্রবাসী এলাকার প্রবীণ আইনজীবী ও সাংবাদিক গজনফর আলী চৌধুরীর খোঁজ-খবর জানতে চান। তিনি ছিলেন সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদের সহপাঠী। এ সময় সৈয়দ মহসিন আলী আকস্মিকভাবে চেয়ার থেকে ওঠে মার্গুব মোর্শেদের দিকে হাত এগিয়ে দিয়ে বলেন ‘আরে হি ইজ মাই ক্লাসমেট।’ বয়সে অন্তত ১৫ বছরের বড় গজনফর আলী চৌধুরীকে সহপাঠী বলায় সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ অনেকটা বিব্রত হয়েই তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেন। এই ওয়ার্ড কমিশনার সেদিনের স্মৃতিচারণ করে আরও বলেন, কিভাবে সাবলীল ভাষায় একটি মিথ্যা কথা সত্য হিসেবে রূপান্তরিত করতে হয় তা তিনি বেশ ভালোই রপ্ত করেছেন।

সোমবার সমাজকল্যাণমন্ত্রী মহসিন আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল ফোন ধরেননি। পরে বেলা ১টা ২২ মিনিটে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী সাইফুল ইসলামের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। প্রতিবেদক তথ্য কর্মকর্তার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করলে মাইদুল ইসলাম কী বিষয়ে তার বক্তব্য প্রয়োজন তা জানতে চান। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ধূমপান করার তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে মাইদুল ইসলাম বলেন, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মহোদয় হয়তো একটি কথা বলেছিলেন এখন এটা নিয়ে টানাটানি করা কি ঠিক হবে? বঙ্গবন্ধু যে পাইপ টানতেন সেটা সবাই জানেন। উনার (বঙ্গবন্ধু) সঙ্গে যদি ধূমপান করে থাকেন এটা ছাপানোর কী আছে। তার পরও বিষয়টি সম্পর্কে মন্ত্রীর বক্তব্য জানানোর আশ্বাস দেন তথ্য কর্মকর্তা। বিকাল ৪টা ৩৭ মিনিটে আবার ফোন করা হলে মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মন্ত্রীকে বলেছিলাম তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ধূমপান করেছিলেন কিনা। জবাবে মন্ত্রী বলেছেন, তিনি কবে কী বলেছেন তা তিনি ভুলে গেছেন।






মন্তব্য চালু নেই