মেইন ম্যেনু

ফলোআপ :

পুলিশের হাতে মারপিটের শিকার তিন শ্রমজীবী নারীকে উল্টো মামলা দিয়ে জেলহাজতে পাঠালো থানা পুলিশ, স্বামীহারা ফাতেমার ৫টি সন্তান না খেয়ে পথে পথে

ফাতেমা খাতুন মুক্তিযোদ্ধা হারুণ গাজীর মেয়ে। বাড়ি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী কেড়াগাছি গ্রামে। স্বামী মুন্না মারা যাওয়ার পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ঠাই নিয়েছেন। কাজ করেন অন্যের বাড়িতে, কৃষিক্ষেতে। এভাবেই চলে তার জীবন সংসার। আরেক গৃহবধূ একই গ্রামের জামাত আলীর স্ত্রী জাহানারা খাতুন (৩৩) ও মুনসুর আলীর স্ত্রী নুরনাহার (৪৫)। এই তিন শ্রমজীবী নারীর সাথে কথা হলো ১৯ মে ২০১৪ সোমবার সকাল ৯টার দিকে কলারোয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তখনও তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ছিলেন পুলিশি প্রহরায়। সকাল ১১টার দিকে যখন কেড়াগাছি গ্রামে নির্যাতিত তিন শ্রমজীবী নারীর বাড়িতে পৌছাই তখন তাদের স্বজনদের কাছে জানতে পারি তাদেরকে কলারোয়া থানার পুলিশ মামলা দিয়ে তাদেরকে সাতক্ষীরা জেলা শহরে পাঠিয়েছে। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা পুলিশের সরকারি কাজে বাধা দিয়েছে। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দিয়েছে। তারা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ভুট্টোলাল গাইনের পরামর্শে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েছিল চিকিৎসা নিতে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তারা চিকিৎসা পাওয়ার পরিবর্তে পুলিশের দায়েরকৃত মামলার আসামি হয়ে এখন জেলহাজতে যাওয়ার পথে। আর এর মধ্যে ঘটনার দিন পুলিশের হাতে মারপিটের শিকার হওয়া এই তিন নারী বর্তমানে মারাত্মক অসুস্থ হওয়ার পরও যথেষ্ট চিকিৎসা পাচ্ছে না, ওষুধ কেনার টাকাও নেই তাদের, ঘরে ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েদের জন্য নেই খাবার। তার উপর তারা এখন মামলার আসামি হয়ে জেলহাজতে যাচ্ছে। সরজমিনে ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১৫ মে বৃহস্পতিবার কলারোয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম কেড়াগাছির আসামি আবদুর রশিদের ছেলে আবদুল আলিমকে ধরতে যায়। কলারোয়া থানার তিন পুলিশ সদস্য (সিভিল ড্রেসে) ও পুলিশের এক সোর্স। এ সময় আসামি আবদুল আলিম তার পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় পুলিশের কাছ থেকে ছুটে যেয়ে সীমান্ত নদী সোনাই সাতরিয়ে ভারতীয় সীমান্তের মধ্যে চলে যায়। এ সময় পুলিশ সেখানে জড়ো হওয়া এলাকাবাসীর উপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে। পরে এক পর্যায়ে কলারোয়া থানা থেকে আরও এক পিকআপ পুলিশ সদস্য যেয়ে সেখানে বাড়ি বাড়ি যেয়ে নীরিহ মানুষের উপর মারপিট করে। এ সময় উল্লেখিত তিন শ্রমজীবী নারী স্থানীয় এক ব্যক্তির পুকুরে মাটি কাটার কাজ করছিল। তারা ওই সময় সকালের খাবার খাওয়ার জন্য বাড়িতে ফিরছিল। ঘটনাস্থলে পৌছালে পুলিশ তাদের উপর চড়াও হয়। তখন তারা জানায়, আমরা কিছুই জানি না কাজ থেকে বাড়িতে যাচ্ছি পান্তা খেতে। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা তাদের কথা না শুনে তখন তাদের উপর বেপরোয়া মারপিট করে। এতে এই তিন নারী মারাত্বক আহত হয়। আহত জাহানারা খাতুন, নুরনাহার, ও ফাতেমা খাতুনের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মারপিটের আঘাতে কালসিটে পড়ে গেছে। এ অবস্থায় তাদেরকে ১৯ মে ২০১৪ সোমবার সরকারি কাজ করার সময় পুলিশকে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। মামলা নং- ১৫, তারিখ- ১৫/৫/২০১৪, ধারা- ১৪৩, ১৩২, ১৫৩, ২২৪, ৩৪। এদিকে, সোমবার সকাল ১১টার দিকে কেড়াগাছি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা কন্য স্বামীহারা ফাতেমা খাতুনের বাড়িতে যেয়ে সরিজমিনে দেখা যায়, তার কিশোরী কন্যা নাজমা (১৩) গ্রামের অন্যদের দেওয়া কিছু চাল রান্না করছে ছোট ছোট চার ভাইকে খাওয়াবার জন্য। তার সাথে কথা বলতে গেলে সে বারবার মুর্ছা যাচ্ছে। কোন কথাই বলতে পারছে না। সে এখন কি করবে। তার মা এখন জেলহাজতে। ভাইদের সে কি খাওয়াবে, মাকে কিভাবে মুক্ত করবে। এসবই এখন তার জিজ্ঞাসা। অসহায় এই পাচ ভাইবোনের কান্নায় এলাকার জড়ো হওয়া মানুষগুলোও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না। ফাতের ভাইয়ের স্ত্রী রোকেয়া জানালেন তার প্রতিবন্ধি স্বামী মিন্টু গাজী (৩২) ওই সময় মাঠে কাজ করছিলেন। তাকেও মারপিট করেছে পুলিশ। প্রতিবাদ করলে আরও মারপিট করেছে সে সময় পুলিশ সদস্যরা। নির্যাতিত জানানা খাতুনের দুই বছরের শিশুটি বাড়িতে কান্নাকাটি করছে দুধ খেতে না পেরে ও মাকে কাছে না পেয়ে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৭ মে শনিবার সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সামনে আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দ ও নারীনেত্রীরা প্রতিবাদ ও তীব্র নিন্দা জানায়। এছাড়া প্রতিবাদী জনতা সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে স্থানীয় বিভিন্ন স্তরের সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ।
১৯ মে ২০১৪ সোমবার সকাল ১১টায় কেড়গাছি গ্রামে ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণীপেশা ও বয়সের নারী, পুরুষ ও শিশুরা সেদিন পুলিশ সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত নির্মম নির্যাতনের যে বর্ণনা দেন তা শুনলে যে কোন মানুষ শিউরে উঠবে।
লারোয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্ব প্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ডা: আবদুর রশিদ জানান, তিনি, আরএমও ডা. কামরুল ইসলাম ও টিএইচও ডা. তৌহিদুর রহমান তিন জন সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদেরকে চিকিৎসা শেষে রিলিজ দিয়েছেন।
কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুন্সি মোফাজ্জেল হোসেন কনক জানান, উল্লেখিত তিন শ্রমজীবী নারীকে সরকারি কাজ করার সময় পুলিশকে বাধা দেওয়া তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আদালতে মাধ্যমে জেলাহজতে প্রেরণ করা হয়েছে।



(পরের সংবাদ) »



মন্তব্য চালু নেই