মেইন ম্যেনু

‘তোর বেতন আসে কোত্থেকে?’

হুমায়রা বিনতে হাফিজ : শিক্ষকতা ভাই, একটা ‘থ্যাংকলেস জব’। ছেলে-মেয়ে পরীক্ষায় খারাপ করল তো দোষ শিক্ষকের। আর ভালো করল তো তাদের- আর কোনো নাম নেই। সবাই দেখবেন, শিক্ষা আর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যখনই কথা বলেন তখন মনে হয়, আমরা যারা এ পেশায় আছি তারা এক একজন রাক্ষস-খোক্ষস। আমরা সব ব্যবসায়ী, টাকা ছাড়া আর কিছু চিনি না।

অথচ আমি সারাজীবন একজন শিক্ষক হবার স্বপ্ন দেখেছি। তাও বাচ্চাদের স্কুলের। তাই সেই স্বপ্ন যখন সত্যি হলো তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছি ছোটো ছোটো বাচ্চাদের মানুষ গড়ার কাজে। নিয়মিত পড়াশোনা করি। প্রযুক্তির এই আমলে গুগল করে শিখেছি পড়ানোর নতুন নতুন পন্থা, আমার গুগল হিস্ট্রি ভরা এইসব দিয়েই। বাচ্চাদের একটু মনযোগের জন্য আমি তাদের পছন্দের গান শোনা শুরু করি, তাদের পছন্দের সিনেমা দেখি, দরকার মতো মনোযোগ আকর্ষণের জন্য এসবের রেফারেন্সও টানি। আমার স্বপ্নের এই পেশার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল বলেই আমি শিক্ষক হিসেবে খারাপ না। কেননা আমি আমার সবটা উজাড় করে দিয়ে আমার কাজটা করি।

একই কথা একই পড়া বারবার পড়িয়ে, বলে-কয়ে মাথায় ঢোকানোর আমার প্রানান্তকর চেষ্টা দেখে আমারই নিজের জন্য মায়া হয় মাঝে মাঝে। এদিকে বাচ্চারা পড়বে না। তাদের বাবা-মায়েরা বাসায়ও পড়াশোনা করছে কিনা সেটা দেখবে না। আবার এ নিয়ে তাদের কিছু বলাও যাবে না। কেননা পড়ালেখা নিয়ে তাদের সন্তানদের সামান্য শাসন করলেই অভিভাবকরা ক্ষেপে যান। পান থেকে চুন খসার অনেক আগেই বাচ্চাদের বাবা মা তেড়েমেড়ে আসেন। এসব তবু মেনে নিয়েছি। কিন্তু এ প্রজন্মের বাবা-মায়েরা আমাদের শিক্ষক কম তাদের বাচ্চাদের আয়া-বুয়া ভাবতে শুরু করে দেন যখন, তখন খুব হতাশ লাগে।

একদিনের ঘটনা বলি,একটা বাচ্চাকে নানানভাবে পড়ানোর চেষ্টা করেও পারছি না। কোনো মেথড কাজে দিচ্ছে না, বললাম ‘কী করব তোমাকে নিয়ে, বলতো? আজকে ক্লাস শেষে প্রজেক্টওয়ার্ক করে তারপর যাবে। একমাস আগে দেয়া জিনিস… ক্লাস টেস্ট-ও তো এটেন্ড করো না।’

এরপর শুরু হলো আসল নাটক।হুট করে ফোন আসলো তারা বাবার। তিনি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে চিৎকার করে বললেন, ‘কুত্তার বাচ্চা! তুই আমার বাচ্চারে কি কইছোস? জানস আমি কে? বাচ্চারে টাকা দিয়া পড়াই না? বেতন আসে কোত্থেকে তোর? বাস্টার্ড! আমার বাচ্চার সব পরীক্ষা নিবি তুই। তোরে আমি দেখে নেব।’

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম ভদ্রলোকের আচরণে। তবু মাথা ঠাণ্ডা রেখে বললাম, ‘আপনি প্লিজ উত্তেজিত হবেন না স্যার! আপনার বিপি বেড়ে যাবে। আপনি তো হার্ট অ্যাটাক করবেন। আমি দেখছি ব্যাপারটা।’

প্রিন্সিপাল ম্যাডামকে ই-মেইল করে পুরো ঘটনাটা জানালাম, সহকর্মীদের জানালাম। তখন সবাই বলল, ‘আরে! ওই ভদ্রলোক তো এমনই। এর আগেও সে অন্য টিচারদের সাথেও এই একই কাজ করেছে। বাকি টিচাররা রীতিমত কান্নাকাটি করেছিল! আপনি যেভাবে হ্যান্ডেল করেছেন। বাহ!’

কিন্তু বিষয়টা আমার খুব গায়ে লেগেছে। আমি বলে বসলাম, ‘উনি মাফ না চাওয়া পর্যন্ত আমি ক্লাস নেব না।’

তিন দিন পর ই-মেইল এলো, সেই অভিভাবক ক্ষমা চাননি। তিনি ক্ষমা চাইবেনও না।

এবার প্রিয় পাঠক আপনারাই বলুন, বাচ্চারা পড়বে না, আমরা শাসন করতে পারব না। করলে অভিভাবক কুৎসিত গালাগাল করে প্রশ্ন রাখবে, ‘তোর বেতন আসে কোত্থেকে?’

বাচ্চারা কথা বলতে গিয়ে গালাগাল করবে, বাজে বাজে কথা লিখবে নিজেদের টেবিলে, চেয়ারে, দেয়ালে, কিন্তু তাদের আমরা শুধরে দিতে পারব না। ভদ্রতা শেখানোর চেষ্টাও করতে পারব না। কারণ করলেই প্রশ্ন আসবে, ‘তোর বেতন আসে কোত্থেকে?’

পরীক্ষায় খারাপ করলে উনারা বলবেন, ‘নাম্বার বাড়ানোর অনেক পদ্ধতি আছে। আপনি সেগুলো এপ্লাই করেন।’

প্রজেক্টওয়ার্কে, ক্লাস টেস্টে, ওয়ার্কশিটে খারাপ করলেও তখন নাম্বার দিয়ে দিতে হবে। না দিলেই প্রশ্ন আসবে, ‘তোর বেতন আসে কোত্থেকে?’ সেই নাম্বার যোগ হবে ফাইনালে। কারণ যোগ না হলেই প্রশ্ন আসবে, ‘তোর বেতন আসে কোত্থেকে?’

পাস করতে না পারলে সহজ প্রশ্ন করতে হবে। কারণ সেটা না করলেই প্রশ্ন উঠবে, ‘তোর বেতন আসে কোত্থেকে?’

সহজ প্রশ্নেও পাস করবে না। তখন একই প্রশ্নে আবার পরীক্ষা নিতে হবে। কারণ না নিলেই পশ্ন আসবে, ‘তোর বেতন আসে কোত্থেকে?’

রেজাল্টে গ্রেড কম এলে আরেকধাপ নাম্বার বাড়াতে হবে। কারণ না বাড়ালে প্রশ্ন আসবে, ‘তোর বেতন আসে কোত্থেকে?’

এসব সমস্যার সমাধান আপনি গুগলে পাবেন না। আপনার প্রিয় বই আপনাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। আজকে একটা জরিপ করা হোক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। সবাই বলবে সমস্ত ত্রুটির দায় শিক্ষকদের, সব দোষ শিক্ষকদের।

কিন্তু শিক্ষকদের এইসব না বলা গল্পগুলো শুনুন, কেবল তখনই জানতে পারবেন আপনাদের বাচ্চাদের মানুষ করার ইচ্ছেটুকুকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন কতখানি অপমান আর অবহেলা সহ্য করতে হয় আমাদের। প্রতিষ্ঠানের মাথাদের কাছ থেকে, বাচ্চাদের কাছ থেকে এবং সবচেয়ে বেশি অভিভাবকদের কাছ থেকে যে অপমান আমরা শিক্ষকরা পাই- তারপরও এ পেশায় কেন পড়ে আছি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে কষ্ট হয়।

আমি নিতান্তই সামান্য মানুষ। কি করা যায় তা জিজ্ঞেস করলে ঠিকমত বলতেও পারব না। কারণ, এই নতুন যুগের সূচনা আরও অনেক আগে, কারণও বিবিধ। আজ এই লেখা ছাপা হলে আমার এই চাকরিটাও হয়তো থাকবে না। আপনারা দুই একদিন দুঃখ করবেন, তারপর নতুন কোনো ইস্যুতে ব্যস্ত হয়ে যাবেন। শিক্ষার প্রসঙ্গ এলে শিক্ষাব্যবস্থাকে দোষ দেবেন, শিক্ষকদের গালাগাল করবেন। কিন্তু সমাধান খুঁজবেন না। দেশে একটার পর একটা প্রজন্ম আসবে, যারা পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষিত হয়তো হবে, কিন্তু সত্যিকারে মানুষ হবে না, সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ হতে পারবে না।

আমি সামান্য একজন শিক্ষক। আমি শুধু ক্লাস ফাইভে পড়া একটা পিচ্চি মেয়ের কথা ভাবি, যে একদিন ভেবেছিল- ‘বড় হয়ে আমি শিক্ষক হব।’ সে আমার প্রতিদিনের দুঃস্বপ্নে ঠোঁট ফুলিয়ে বলবে- ‘আমি কি শিক্ষক না হয়ে অন্যকিছু হবার স্বপ্ন দেখে আরেকবার বড় হতে পারি?’

লেখক: স্কুল শিক্ষক






মন্তব্য চালু নেই