মেইন ম্যেনু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬শ একর জমি এসে ঠেকেছে ২৫৮ একরে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে জমির পরিমাণ ৬শ একর থাকলেও বর্তমানে তা ২৫৮ একরে এসে ঠেকেছে। ৬শ একর জমির মধ্যে বেহাত রয়েছে ৩৪২ একর জমি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে তার সম্পত্তি আর শিক্ষার্থীরা হারিয়েছে একটি মনোরম ক্যাম্পাস।
কাগজে-কলমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তির পরিমাণ ৬০০ একর উল্লেখ থাকলেও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে চলে যাওয়ায় তা ২৫৮ একরে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় অনুভূতি, দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্ব ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৩০০ একর জমি হাতিয়ে নিয়েছে এসব দখলবাজরা।
পুলিশ ফাঁড়ি, পরমাণু শক্তি কমিশন, ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অধীনেও রয়েছে প্রায় অর্ধশত একর জমি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রবীণ শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবন রিকুইজিশন করে তৎকালীন সরকার গড়ে তোলে সামরিক হাসপাতাল। পরে এটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আর পাকিস্থান আমলে প্রশাসনিক ভবন দখল করে প্রতিষ্ঠা করা হয় হাইকোর্ট।
এরপর ক্রমান্বয়ে বুয়েট, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা, সচিবালয়, পাবলিক লাইব্রেরি, জাতীয় জাদুঘরের জন্য জমি ছেড়ে দিতে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। এর বাইরে মিন্টু রোড ও হেয়ার রোডে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট হাউসগুলোও সরকার রিকুইজিশন করে নেয়। উপরন্তু, এখনও অনেক জমি কাগজে-কলমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা থাকলেও কর্তৃপক্ষ নানা কারণে এসব জমি বুঝে পাচ্ছে না।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে টঙ্গীর ফৈজাবাদ পুরাবার ও দক্ষিণখানে এক হাজার একর জমি কেনা হয়। জমির মূল্য বাবদ সে সময় ৩২ লাখ টাকা পরিশোধও করা হয়। বিশাল এ জমির নেই কোনও কাগজপত্র। এমনকি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্রেও এর কোনো সঠিক উল্লেখ নেই।
এছাড়া ফজলুল হক হলের দক্ষিণে অবস্থিত খেলার মাঠ রেলওয়ে সম্প্রসারণের জন্য নিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে এর পাশের আরও জমি দখল করে নেয় প্রভাবশালীরা। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর কিছু অংশ উদ্ধার করলেও বড় অংশ এখনও বেদখল রয়ে গেছে।
১৯৭৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জাতীয় জাদুঘরকে ৩ একর জমি প্রদান করে। শর্ত ছিল, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাদের ছেড়ে আসা এলাকার ৪ একর জমিসহ ভবনাদি বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে দিবে। কিন্তু জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও সরকার সে জমি এখনো দেয়নি।
এছাড়া ১৯৯২ সালে সরকার পরমাণু শক্তি কমিশনের পাশের জমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পরমাণু শক্তি কমিশনের জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ করলেও ঢাবির জমি ছাড়েনি পরমাণু শক্তি কমিশন। পরমানু শক্তি কমিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কারণে এমনটি হয়েছে বলে জানা গেছে।
ফার্মগেটের কাছে গ্রীণরোডে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ দশমিক ৯৯ একর জমি রয়েছে। তবে এর বেশিরভাগই এখন বেদখলে। এসব জমি খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী সমিতির নেতারা বস্তি হিসেবে ভাড়া দিচ্ছেন। এছাড়া গ্রীণরোডে আইবিএ হোস্টেলের সামনের গ্রীনসুপার মার্কেট, কাটাবন বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটের অধিকাংশ দোকানই রাজনৈতিক নেতারা নামমাত্র মূল্যে পজিশন ক্রয় করে ব্যবসা করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রয়াত অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব তার সম্পত্তির অর্ধেক দান করে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। ধানমন্ডির ৪/এ রোডের প্রায় সাড়ে ৭ কাঠার ওই জমির ওপর ৬১ নম্বর বাড়িটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি। জায়গাটি আনোয়ারুল হক নামের এক পীর দখল করে খানকা শরিফ প্রতিষ্ঠা করেছেন। জমিটি উদ্ধারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বর্তমানে অন্তত ৫টি মাজার ও খানকা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি দখল করে এসব খানকা গড়ে উঠলেও স্পর্শকাতর হওয়ায় উচ্ছেদে তাগাদা নেই কর্তৃপক্ষের। টিএসসি, দোয়েল চত্বর, শহীদ মিনারসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত এসব খানকা থেকে সরকারদলীয় প্রভাবশালীরা বিভিন্ন ইস্যুতে অনেক টাকা আয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিতে গড়ে উঠেছে বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি। এ জায়গায় পুলিশের জন্য ২০ তলা ভবন তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হলেও বর্তমানে তা স্থগিত আছে। এছাড়া স্যার এএফ রহমান হলের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯ দশমিক ৭ একর জায়গা দখল করে আছে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি। বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীরা ফাঁড়িটি স্থানান্তরের জন্য আন্দোলন করলেও এটি সরিয়ে নেওয়া হয়নি।
পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কর্মকর্তা জীবন কুমার মিশ্র বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ৬০০ একরের মধ্যে বর্তমানে ২৫০ একরের কিছু বেশি জমি তাদের দখলে রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েক একর ইতোমধ্যে হাতছাড়াও হয়েছে। এতে নতুন একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্টেট ম্যানেজার সুপ্রিয়া দাস বলেন, “কিছু জমি উদ্ধারে আইনি লড়াই চলছে। এছাড়া অনেক জমিতেই এখন দখল প্রতিষ্ঠা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “আমরা অনেক জমি উদ্ধার করেছি। বেশ কিছু জমি উদ্ধারের চেষ্টা করছি। তবে টঙ্গীর জমির বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।”






মন্তব্য চালু নেই