মেইন ম্যেনু

জেএমবির সিরিজ বোমা হামলা, থমকে আছে ৫৯ মামলা , বিচারের আওতায় আসেনি সহায়তাকারীরা

সকাল ১০টা। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ। সেখানে অবস্থানরত বিচারপ্রার্থী, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করেন। আবার ঘটে বিস্ফোরণ। মোবাইল ফোনে খবর ছড়িয়ে যায় সবখানে। সুপ্রিম কোর্টের সবার ধারণা হয়, দুষ্কৃতকারীদের বিচ্ছিন্ন কাজ এটা। কিন্তু ভুল ভাঙে একটু বাদেই। খবর আসে- রাজধানীর প্রেসক্লাব, রাজারবাগ, নিউ মার্কেট, ফার্মগেট, জজকোর্ট, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, উত্তরা, ধানমণ্ডিতেও বিস্ফোরণ ঘটেছে। কিছুক্ষণ পর খবর মেলে, দেশের ৬৩ জেলায় চার শরও বেশি স্থানে সকাল ১০টা থেকে বোমা হামলা চালানো হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। সেদিন সব বিস্ফোরণস্থলের পাশে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের একটি লিফলেটও পাওয়া যায়। তাতে উল্লেখ ছিল, ‘দেশে কর্মরত বিচারকদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা পাঠালাম। দ্রুত এ দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে হবে। নতুবা কঠিন পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে জেএমবি। ইসলামী হুকুমত কায়েমের বিষয়ে দেশ-বিদেশের অনেক শক্তি ও শীর্ষ রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছে। অতএব যারা বিচারক আছেন, ইসলামী আইনে বিচার করবেন। নতুবা আরো ভয়াবহ বিপদ আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।’ লিফলেটে আরো বলা হয়, ‘এ সতর্কবাণীর (সিরিজ বোমা হামলা) পর আমরা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করব। তারপর আবার হামলা শুরু হবে।’
জেএমবির সিরিজ বোমা হামলা, থমকে আছে ৫৯ মামলা
আজ সেই ভয়াল সিরিজ বোমা হামলার ৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এ ঘটনায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয় ১৬১টি। এগুলোর মধ্যে এখনো ৫৯টির বিচারকাজ ঝুলে আছে। ওই ঘটনার পরও বেশ কিছুদিন ধরে একের পর এক বোমা হামলা চালায় বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত এই জঙ্গি সংগঠন।
ওই সব মামলার প্রধান আসামি করা হয় শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানী ও আবদুল আউয়ালকে। এদেরসহ ছয়জনকে ঝালকাঠির দুই বিচারক হত্যা মামলায় ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। সারা দেশের মামলাগুলোতে আসামি করা হয় ৬৬০ জঙ্গিকে। এদের মধ্যে পলাতক অনেকে। গোপনে তারা এখনো সক্রিয়। অনেকে খালাস পেয়ে ফের একই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই ঘৃণ্য জঙ্গি তৎপরতায় যারা সহায়তা করেছিল তারা আছে বহাল তবিয়তে। এমনকি জঙ্গিদের অর্থের জোগানদাতারাও শনাক্ত হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝুলে থাকা মামলার সাক্ষীদের খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। ফলে বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। ওই ঘটনার বার্ষিকী ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের ইন্ধনে দেশে একসময় জঙ্গি উত্থান ঘটেছিল। তারা একযোগে বোমা হামলা চালানোর সাহস পেয়েছিল। ওই হামলার ঘটনায় অনেক মামলার বিচার হয়েছে। বাকিগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া চলছে। দ্রুত তা শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, পলাতকদের খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চেষ্টা চালাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিরিজ বোমা হামলার পর শুরু হওয়া অভিযানেও দেশ থেকে জঙ্গিদের নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। উল্টো তারা ফের সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টায় আছে। শীর্ষপর্যায়ের নেতারা গোপনে বৈঠক করছেন বলে খবর আছে। বোমা হামলার পর জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাই বলেছিলেন, ‘জানান দিতেই হামলা চালানো হয়েছে। সামনে আরো বড় ধরনের হামলা চালানো হবে। আমাদের সাথে বড় বড় নেতারা আছেন।’ অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি-জামায়াত জোটের সাবেক দুই মন্ত্রী ও পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জেএমবিকে সব ধরনের সহযোগিতা করেছিলেন। একপর্যায়ে সমালোচনার ঝড় ওঠায় জোট সরকার জেএমবির শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের গ্রেপ্তার অভিযান শুরু করে। একে একে ধরা পড়েন বাংলা ভাই, শায়খ রহমান, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়ালসহ অনেকে। আদালত তাঁদের ফাঁসির আদেশ দেন।
র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, ‘জেএমবিসহ অন্যান্য জঙ্গির শক্তি-সামর্থ্য আগের মতো নেই। তাদের যারা লালন-পালন করেছিল তাদের চিহ্নিত করার কাজ অব্যাহত আছে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। জঙ্গিদের বড় ধরনের নাশকতা চালানোর শক্তি অবশিষ্ট নেই। এর পরও আমরা তৎপর আছি।’
মামলার সংখ্যা ও বিচারিক কার্যক্রম : রাজধানীর প্রেসক্লাবের সামনে, তেজগাঁওয়ের ফার্মগেট এলাকা, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, নিউ মার্কেট ও ঢাকার আদালতপাড়ায় বোমা হামলার বিচারকাজ এখনো ঝুলে আছে। শুধু এ চারটিই নয়, রাজধানীসহ সারা দেশের আরো ৫৫টি স্থানে বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার সাক্ষীর অভাবে এগোচ্ছে না।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ১৬১টি মামলায় ৬৬০ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় ৪৫৫ জনকে। মামলার মধ্যে ১০২টির রায় হয়েছে। এসব রায়ে সাজা হয়েছে ২৪৭ জনের। ফাঁসির আদেশ হয় ১৫ জনের বিরুদ্ধে। খালাস পায় ১১৮ জন। এখনো ৫৯ মামলার রায় হয়নি। আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে এসব মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বেশির ভাগ সাক্ষী ঠিকানা পাল্টে ফেলেছে বলে পুলিশ দাবি করছে।
ফাঁসির রায় কার্যকর : তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৭ সালের ২৯ মে ঝালকাঠির দুই বিচারক হত্যা মামলায় কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও কাশিমপুর কারাগারে একযোগে শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান ও মামুনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এরপর সংগঠনের দায়িত্ব নেন মাওলানা সাইদুর রহমান। তিনিও গ্রেপ্তার হয়ে গেলে মাওলানা সায়েম সংগঠনের হাল ধরেন। আরেক জঙ্গি সংগঠন হুজির শীর্ষস্থানীয় নেতা মাওলানা তাজউদ্দিনের সঙ্গে আঁতাত করে সংগঠনকে শক্তিশালী করার চেষ্টায় আছেন মাওলানা সায়েম।
থানায় বিচারকের জিডি : জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ জাকির হোসেন দুই বছর আগে সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। আদালতের ভেতরেই প্রকাশ্যে জঙ্গিরা তাঁকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। ফলে তিনি ওই মামলার কার্যক্রম চালাতে অস্বীকৃতি জানান। পরে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ট্রাইব্যুনাল ওই মামলার রায়ে ১০ জঙ্গির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন।
জঙ্গিদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা : সিরিজ বোমা হামলার পর তৎকালীন সরকার ২০০৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর জঙ্গিদের ধরিয়ে দিতে এক কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। এর মধ্যে ছিল জেএমবির মজলিসে শুরার প্রতি সদস্যর জন্য ১০ লাখ টাকা, আত্মঘাতী সদস্যদের জন্য দুই লাখ টাকা ও এহসার সদস্যদের জন্য এক লাখ টাকা করে। কিন্তু শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ যেসব শীর্ষ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়েছিল, তাদের ধরিয়ে দেওয়া লোকজন পুরস্কারের টাকা এখনো পাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বেশির ভাগ জঙ্গি নেতাকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু পুরস্কারের টাকা আমরা পাইনি। তা ছাড়া আমার জানা মতে, সোর্সদেরও কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। এ কারণে অনেক জঙ্গিকে জনগণ চিহ্নিত করছে না।’
তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ : পুলিশি তদন্তে অনেক গাফিলতির অভিযোগ আছে। ঘটনাস্থলে বোমা হামলায় কারা জড়িত তা পুরোপুরি বের করতে পারেনি পুলিশ। অনেক ক্ষেত্রেই অকাট্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। যে কারণে দুই শতাধিক আসামি বিভিন্ন মামলায় খালাস পেয়ে গেছে। তখন যারা জেএমবিকে সহায়তা করেছিল বলে কথা উঠেছিল, তাদেরও কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। ২০০৫-এর শেষের দিকে গ্রেপ্তার করা হয় শায়খ আবদুর রহমানের ছোট ভাই জেএমবির সামরিক বাহিনীর প্রধান আতাউর রহমান সানিকে। ২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সানি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, আগের বছর যুক্তরাজ্য (লন্ডন) থেকে আবদুর রহমান ও সাজ্জাদ নামে দুজন ঢাকায় এসে শায়খ আবদুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে। তারা দুজনই দশ হাজার পাউন্ড সহায়তা দেয়। ভারতের দেলদুয়ারের বেলাল, মোহতাসিম ও সালাউদ্দিন মাঝেমধ্যে শায়খ রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করতে আসত। অথচ গত ৯ বছরে এসব বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়নি। এ ছাড়া সানির জবানবন্দিতে দক্ষিণাঞ্চলের দুর্ধর্ষ জঙ্গি আসাদুজ্জামান হাজারি, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলের নসরুল্লাহ, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের সানাউল্লাহ, জামালপুরের নাহিদ, সুমন, কিবরিয়া, জয়পুরহাটের মোমতাজুল, মির্জাপুরের আকরামদের নাম আসে। কিন্তু এরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জঙ্গিদের সাংকেতিক ভাষা : পলাতক জঙ্গিদের গোপনে আবারও সংগঠিত হওয়ার তৎপরতার কথা গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে। তারা নিজেদের মধ্যে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে। ইতিমধ্যে আটক জঙ্গিরা র‌্যাবকে জানিয়েছে তারা গ্রেপ্তারকে ‘অসুস্থ’, কারামুক্তিকে ‘রোগমুক্ত’ বা ‘সুস্থ’, পুলিশকে ‘জুনুদ’, অস্ত্রকে ‘সামান’, বোমাকে ‘মেওয়া’ এবং গোয়েন্দাদের ‘ভাইরাস’ বলে আখ্যায়িত করে।
কারাগারে যারা আটক : গোয়েন্দাদের হিসাব অনুযায়ী, জেএমবির আমির মাওলানা সাইদুর রহমান, নাইমুজ্জামান, সোহাগ, শাহাদৎ হোসেন, লাল্টু, মালেক নান্টু, জুলফিকার আলী, আবু জাফর, জাহিদুর রহমান, হোসেন সজিব, ইউনুস আলী, দেলোয়ার হোসেন দুলাল, মনির ওরফে রিপন, আবুল খায়ের, মুসা, আবদুল মতিন ওরফে জাকির, মোহাতাসিম বশির ওরফে নাসির, আবুল কালাম, গুলজার হোসেন, নুর আলম, নাবিল রহমান, জাহেদ ইসলাম, সুমন, জাবেদ ইকবাল, শাহাদৎ, সেন্টু, সাইফুল্লাহ, জাহিদুর রহমান ওরফে জাহিদ, মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান, তারিকুল্লা রুবেল, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ বাতেন, দেলোয়ার হোসেন সজিব, ইউনুছ আলী, দেলোয়ার হোসেন দুলাল, মনির হোসেন রিপন, মোহাম্মদ ইউসুফ আল আসাদুল্লাহ বিন ওয়াহিদুল্লা প্রমুখ কারাগারে আটক আছে।
পুলিশের সতর্কতা : পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, সিরিজ বোমা হামলার দিনকে সামনে রেখে সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সুপারদের বিশেষ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সন্দেহভাজন লোকদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ ছাড়া যানবাহনে তল্লাশি চালাতে বলা হয়েছে।






মন্তব্য চালু নেই