মেইন ম্যেনু

ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করেছিলেন নূর হোসেন!

নারায়ণগঞ্জ’র সিদ্ধিরগঞ্জের এরশাদ শিকদার খ্যাত ‘মানুষ খেকো’ নূর হোসেন শুধু সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষের সঙ্গেই অমানবিক আচরণ করেননি, তার হিংস্রতা থেকে রক্ষা পায়নি নিজের সন্তানও। তার বিরুদ্ধে নিজ সন্তান বিপ্লব হোসেনকে(২২) পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগও রয়েছে।

গেল বছরের ১১ নভেম্বর রাতে নূর হোসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী লিপির পক্ষের বড় ছেলে বিপ্লবের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়।

স্থানীয়রা জানায়, গলায় ফাঁস দেয়ার পর পরিবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে কাচঁপুরের সাজেদা হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ সময় হাসপাতালের কর্ত্যবরত চিকিৎসক বিপ্লবকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন ১২ নভেম্বর বিপ্লবের লাশ শিমরাইল ট্রাক স্ট্যান্ডে জানাজা শেষে মিজমিজির পাইনাদী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এলাকাবাসী জানায়, বিপ্লবকে হাসপাতালে নেয়া থেকে শুরু করে লাশের জানাজা ও দাফন সবকিছুই সম্পন্ন হয়েছে পুলিশ পাহারায়। তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মনোজকান্তি বড়াল ও পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন আরও অনেক কর্মকর্তা ১১ নভেম্বর রাত থেকে ১২ নভেম্বর লাশের দাফন হওয়ার আগ পর্যন্ত নূর হোসেনের সঙ্গেই ছিলেন। এমনকি ডিসি, এসপি ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের উপস্থিতিতে বিপ্লবের লাশ দাফনও করা হয়।

আত্মহত্যার কারণে বিপ্লবের মৃত্যু হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলেও কোনো রকম ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফন করা হয়েছে।

যে কবরস্থানে বিপ্লবের লাশ দাফন করা হয়েছে সেই পাইনাদী কবরস্থান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম ইমরান হোসেন জানান, ইসলামের বিধান অনুসারে যদি কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করে মারা যান তবে তার জানাজা হয় না এবং কোনো কবরস্থানে তাকে দাফন করারও নিয়ম নেই।

যদি তাই হয় তবে কেন বিপ্লবের লাশের জানাজা করার পর ধর্মীয় বিধান ভঙ্গ করে কবরস্থানে দাফন করতে দেয়া হলো এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমাকে জানাজা পড়াতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আমি যেতে পারিনি। সেদিন আমি ঢাকায় ছিলাম। আর কেন কবরস্থানে কবর দেয়া হলো সেটা আমাদের মুত্তায়ল্লি সাহেব বলতে পারবেন। বিপ্লবের লাশ নূর হোসেনের বাড়ির সামনে মসজিদের লোক দিয়ে গোসল করানো হয় বলে তিনি জানান।

ওই কবরস্থানের মুত্তায়ল্লি আব্দুল আলী একই নিয়মের কথা উল্লেখ করে বলেন, যখন ঘটনাটা ঘটে তখন নূর হোসেন ছিলেন প্রচণ্ড প্রভাবশালী। জানাজা আর দাফন করতে ডিসি এসপিসহ পুলিশের উর্ধ্বতর কর্মকর্তারা এসেছিলেন। একই সঙ্গে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়াসহ অনেক সাংবাদিকও এসেছিলেন। সেদিন তো এমন প্রশ্ন কেউ করেনি? এ ব্যাপারে আর বেশি কিছু বলতে চাই না।

বিপ্লবের লাশ দাফন করতে কবরস্থানের রেজিস্ট্রি খাতায় নাম লেখা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে মুত্তায়ল্লি নাম এন্ট্রি করার কথা স্বীকার করেন। তবে রেজিস্ট্রি খাতা দেখতে চাইলে দীর্ঘক্ষণ পরে তা দেখাতে পারেননি। তিনি জানান, দাফন খরচ বাবদ নূর হোসেন কবরস্থানের কমিটির কাছে তিন হাজার টাকা জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সে টাকা পরিশোধের রশিদ দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে পারেনি।

সবশেষে মুত্তায়াল্লি জানান, বিপ্লবের দাফন করার দিনে তিনি ভারতে ছিলেন। দাফনের পরদিন সিদ্ধিরগঞ্জে এসেছিলেন।

সাত খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি করা ও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরে এসব বিষয় এখন আলোচনা উঠে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, বিপ্লবের লাশ কাউকে ভালোভাবে দেখতে দেয়া হয়নি। কারণ তাকে পিটিয়ে হত্যার কারণে শরীরে অনেক আঘাতের দাগ ছিল। তাই কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিপ্লবের লাশ জানাজার জন্য গোসল করানো হয়।

সিদ্ধিরগঞ্জের টেকপাড়া এলাকায় যে মসজিদের লোক দিয়ে বিপ্লবের মরদেহের গোসল করানো হয়েছে সেখানে গিয়ে কথা বলার জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. দুলাল চন্দ্র চৌধুরী জানান, মৃত ব্যক্তির মাঝে কিছু লক্ষ্মণ থাকে যেগুলো দেখেই নিশ্চিত হওয়া যায় আসলে ব্যক্তিটি কীভাবে আত্মহত্যা করেছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে তিনি নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসারের (আরএমও) সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের আরএমও আসাদুজ্জামান জানান, যদি কেউ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে তাহলে তার গলায় দাগ থাকবে। শ্বাসনালী ও ফুসফুসে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার লক্ষ্মণ থাকবে। যা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মৃত ব্যক্তি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

ঘটনার দিন ১১ নভেম্বর রাতে বিপ্লবকে স্থানীয় সাজেদা হাসপাতালের নিয়ে যাওয়া হলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই হাসপাতালের ম্যানেজার শাহজাহান জানান, ঘটনার দিন রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে বিপ্লবকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়। তখন আমি হাসপাতালে ছিলাম না। জরুরি বিভাগের ডা. সাকিব ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রুহি কমল তাকে দেখেন। দুই চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, বিপ্লবকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল। আমাদের চিকিৎসদের ধারণা হাসপাতালে আনার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা আগেই বিপ্লব মারা গিয়েছিল। এরপরও আমাদের যেহেতু বেসরকারি হাসপাতাল তাই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ বা নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল।

ম্যানেজার শাহজাহান আরও জানান, বিপ্লবকে হাসপাতালে আনার সময় তাদের সঙ্গে পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও অনেক সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

বিপ্লবকে মৃত ঘোষণা করা ডা. সাকিব বর্তমানে সাজেদা হাসপাতালে আর চাকরি করেন না। এ ব্যাপারে ডা. রুহি কমল জানান, ওই রাতে বিপ্লবকে ব্রড ডেথ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। কী কারণে বিপ্লবের মৃত্যু হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বিপ্লবের মাঝে পালস্, প্রেসার, হার্টবিট কিছুই পাইনি। সে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল বলে শুনেছি।

গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করার মত কোনো লক্ষ্মণ ছিল কিনা জানতে চাইলে ডা. রুহি জানান, তেমন কোনো কিছু দেখতে পাইনি। গলায় কোনো দাগ ছিল না। জিহবাও বের হয়ে আসেনি। এছাড়া তার পরিবারের পক্ষ থেকে লাশের ময়নাতদন্ত না করায় নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কোনো কারণ বলতে পারছি না।

স্থানীয় সূত্রমতে, বিপ্লব ভারতের একটি কলেজে পড়াশুনা করতেন। নূর হোসেনের চতুর্থ স্ত্রী রুমার বোনের মেয়ে (খালাতো বোনের) সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে দুইজন গোপনে পালিয়ে বিয়ে করেন। বিষয়টি জেনে নূর হোসেন বিপ্লবের ওপর ক্ষুব্ধ হন। এ সময় বিয়ে মেনে নেয়ার কথা বলে কৌশলে তাদের শিমরাইলের বাসায় আসতে বলেন। বাবার কথামতো বিপ্লব স্ত্রীকে নিয়ে ফিরে আসেন বাসায়। এরপর নূর হোসেন তার ছেলেকে তখনি তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে খালার বাসায় পাঠিয়ে দেয়ার আদেশ দেন। অন্যথায় বিপ্লব গায়েব হয়ে যাবে বলে জানানো হয়। বাবার নির্মমতার কাছে ছেলে হার মানে। স্ত্রীকে তালাক দেয়। এরপর হয়ে পড়ে মাদকাসক্ত।

বিপ্লব নূর হোসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী লিপির পক্ষের সন্তান। লিপি বর্তমানে দুবাইতে অবস্থান করছেন। ১৯৮৯ সালে নূর হোসেন তাকে বিয়ে করেন। তিন বছর পর ১৯৯২ সালে লিপিকে তালাক দেন। এর আগেই জন্ম নেয় বিপ্লব। তালাক দেয়ার পর ছেলে বিপ্লবকে নিজের কাছে রেখে দেয় নূর হোসেন। মা লিপির সঙ্গে বিপ্লবকে যোগাযোগ করতে দিতেন না নূর হোসেন।






মন্তব্য চালু নেই