মেইন ম্যেনু

চীন সাগর দখলে ভারতকে পাশে চায় ট্রাম্প!

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েই ঝড়ের বেগে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরপর বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলোর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের আগেই নজর দিয়েছেন দক্ষিণ চীন সাগরে। ঘোষণা দিয়ে ফেলেছেন এটিকে দখল করার। শপথের মাত্র চার দিনের মাথায় ফোন দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। তার সঙ্গে কথা হয়েছে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্য বিষয়ে।

বিশ্বের ক্ষমতাধর এই প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গভীরভাবে নজর রাখছে পরাশক্তি চীন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এশিয়ায় প্রভাব বাড়তে চীনকে শায়েস্তা করার উদ্যোগ নেবে ট্রাম্প। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই চীনের চির শত্রু ভারতকে কাজে লাগাতে চায় দেশটি। যদি এটি বাস্তবায়ন হয় তাহলে এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে কেমন প্রভাব পড়বে তা নিয়ে এখনই ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন অনেকেই।

সাধারণত রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। কিন্তু ট্রাম্প সেই তালিকা বাদ দিয়ে প্রথমেই ফোন দিয়েছেন মোদীকে।

অবশ্য মোদীর সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না চীন। তারা অপেক্ষা করছে এশিয়ায় ট্রাম্পের নীতি কেমন হবে তা জানতে। তবে ট্রাম্পের নীতি যাই হোক, এশিয়ায় নিজের অস্তিত্ব বাড়াতে কোনো রকম ছাড় দিতে রাজি নয় চীন। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ট্রাম্প। শপথের পরেই ট্রাম্প দক্ষিণ এশিয়ায় নজর দেয়াকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এ এলাকার দেশগুলো।

মূলত, সমুদ্রপথে নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে চীনের বাণিজ্য অর্থনীতি। দেশটি অর্থনৈতিক শক্তি দিয়েই সব অস্ত্রকে পরাস্থ করতে চায়। তাই এশিয়ার অন্যান্য দেশেও বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে। এশিয়ার পাওয়ার হাউস হতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে দেশটি। চীনের ইলেকট্রনিক পণ্য এখন পুরো বিশ্বজুরে। অর্থনৈতিক চালে খোদ যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পেরে উঠছে না। সেই দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দক্ষিণ চীন-সাগর।

প্রতিরক্ষা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চীনা নৌবাহিনী প্রায়ই দূর সমুদ্রে মহড়া পরিচালনা করে আসছে। সক্ষমতা অর্জনে দিন দিন তা বাড়িয়েই চলছে। সম্প্রতি চীনা নৌবাহিনী সোমালিয়া উপকূলে আন্তর্জাতিক জলদস্যুবিরোধী টহলেও যোগ দিয়েছে। সামরিক বাহিনী বিশেষ করে নৌবাহিনীকে আধুনিকায়ন করার একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচিতে কয়েক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। এই মহড়া অব্যাহত রাখতে বৈশ্বিক কোনো চাপ বা উসকানিকে পাত্তা দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। উপরন্তু রাশিয়া সীমান্তে একাধিক পরমাণু বোমা বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম মোতায়েন করেছে চীন। এভাবেই চীন তার সক্ষমতার বিভিন্ন বিষয় জানান দিচ্ছে বিশ্বকে।

২০১৫ সালে পাঁচটি চীনা জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় বেরিং সাগরের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় অনুশীলন পরিচালনা করে। সামরিক মহড়া চালানো অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দূর সমুদ্রে চীনের একমাত্র এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের মহড়া স্বাভাবিকভাবে চলবে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি। এদিকে গত মাসে চীনের ক্যারিয়ার ‘দ্য লিয়াওনিং’ বেশকিছু যুদ্ধবিমান সহকারে স্বশাসিত তাইওয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে পরিভ্রমণ করে।

নৌবাহিনীর অনুশীলন সম্পর্কে চীন জানায়, বাণিজ্যপথ সুরক্ষা করতে দেশের ‘ব্লুওয়াটার’ সক্ষমতা বিকাশের আইনসঙ্গত প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে চীনের অর্থনীতি এই বাণিজ্যপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং বিশ্বের প্রতি নিজের দায়িত্ব তুলে ধরার জন্যও চীনের নৌ-সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে বলে দেশটি জানায়।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে চীনা সামরিক বাহিনী প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সংকটে অন্য দেশকে সহায়তা করে। সে সময় চীনের একটি রণতরী সংঘাতময় ইয়েমেন থেকে বিদেশি নাগরিকদের সরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

সাগর নিয়ে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
গত ২৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানান হয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অধিকার রক্ষা করবে আমেরিকা। অর্থাৎ ওই অঞ্চল দিয়ে মার্কিন বাণিজ্যিক তরিগুলোর যাত্রা পথ রক্ষা করবে তারা। মুখপাত্র শেন স্পাইসার জানিয়েছেন, দক্ষিণ চীন সাগর কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সম্পত্তি নয়। ফলে এটি রক্ষা করার জন্য সব রকমের চেষ্টা করবে আমেরিকা। এই সাগরে আন্তর্জাতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।

এই ঘোষণার পরেই চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা পিপল’স ডেইলি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিদেশি চাপ সত্ত্বেও দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক মহড়া অব্যাহত রাখবে চীন। দক্ষিণ চীন সাগরে দ্বীপ নির্মাণ বন্ধ রাখবে না চীন। এতে কোনো ধরণের উসকানি ও বিদেশি চাপকে গুরুত্ব দেবে না বেইজিং।

ট্রাম্প-মোদী ফোনালাপ
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালোপ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। এ ফোনালাপের বিষয়টি প্রচার করেছে হোয়াইট হাউস। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে ফোনালাপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতকে প্রকৃত বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ক্ষেত্রে ভারতকে তারা পাশে পাবে বলেই মনে করেন ট্রাম্প। এখন চলতি বছরের শেষের দিকে মোদীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের দিকে তাকিয়ে থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যের মতো বৃহত্তর ক্ষেত্রে কীভাবে দু’দেশের সম্পর্ক আরো মজবুত করা যায়- তা নিয়ে আলোচনা করেছেন ট্রাম্প ও মোদী। তারা গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় দুই দেশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়বে বলে ঠিক করেছেন দুই প্রেসিডেন্ট। হোয়াইট হাউস বিবৃতি দেয়ার পরই মোদী টুইট করেন, উষ্ণ আলোচনা হয়েছে। দু’জনই দু’দেশের সম্পর্ককে আরো মজবুত করার বিষয়ে সম্মত হয়েছি। ট্রাম্পকে ভারতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি।

প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বের পরাশক্তি চীন, রাশিয়া, ব্রিটেন, জার্মানি ও জাপানের মতো দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলার আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টেলিফোন আলাপ অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন অনেকে। বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সত্যিকারের বন্ধু রাষ্ট্র ও অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করার মধ্য দিয়ে চীনের সঙ্গে মার্কিনের সম্পর্কের নতুন মাত্রা পাবে।

বলা প্রাসঙ্গিক, নির্বাচনের সময়ই ট্রাম্প বলেছিলেন, ভারতই হতে চলেছে সবচেয়ে ভালো বন্ধু। দায়িত্ব নেয়ার পর মোদীকে ফোন করার মধ্য দিয়ে তার প্রমাণ হয়েছে। ভারত ও চীন নিয়ে ট্রাম্পের ছক যে অনেক আগে আঁকা হয়েছে তাও প্রমাণ হয়। যদিও ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট ও অভিবাসন নীতিতে বড় সমস্যায় পড়বে ভারতের আইটি খাত ও স্টিলের পাইপ সরবরাহকারীরা। এই খাত থেকে ভারত প্রতিবছর আমেরিকা থেকে প্রচুর অর্থ আয় করে। এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে ভারতের শিল্পপতিরাও। এখন দেখার বিষয় এটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করে ভারত। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছে, নিজেদের স্টিল পাইপলাইন নিজেরাই বানাবে। আমেরিকায় স্টিলের পাইপ সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে ভারত উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

চীন-ভারত বিরোধ
এশিয়ার পরাশক্তিধর দেশের মধ্যে একটি হচ্ছে ভারত। দেশটি পারমাণবিক শক্তিধর হলেও জাতিসংঘের স্থায়ী পরিষদের সদস্য নয়। দেশটি কয়েক বছর ধরেই চাইছে সেই সদস্য পদ নিতে। এক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন। নিয়ম অনুযায়ী আবার চীনের অমতে ভারত সেই পদ নিতে পারবে না। তাই চির শত্রু চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক রক্ষায় ভারতকে ভাবতে হয় অনেক। অপরদিকে চীনের মিত্র বলে খ্যাত পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক কোনো কালেই ভালো ছিল না ভারতের। চীনকে দমিয়ে রাখতে ভারত যদি ট্রাম্পের নীতিতে চলে তাহলে এর প্রভাব কী হতে পারে তা বলতে সময় লাগবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এশিয়া এখন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য উর্বর অঞ্চল। সেখানে বাণিজ্যনীতিতে ট্রাম্প কেমন আচরণ করবেন তার উপরই নির্ভর করছে এ অঞ্চলের অর্থ ও ভূ-রাজনৈতিক চিত্র। এশিয়া বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সকলের জানা। পাকিস্তান, চীন, মিয়ানমার ও ভারত এবং এর পাশে থাকা অন্যান্য ছোট রাষ্ট্রকে হিসাব করেই ট্রাম্পকে তার নীতি-কৌশল করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।






মন্তব্য চালু নেই