মেইন ম্যেনু

চন্দ্রমায় দেখি মুখ | তাসলিমা আক্তার

যৌবন উপচে পড়ছে বিপাশার শরীর থেকে। খাপেবন্ধ তলোয়ার। কাপড়ের খাপে লুকিয়ে রাখা হিলহিলে যৌবন। সাদা কামিজের ভেতর ঝনঝন করে উদ্যত শরীরের খাঁজ-ভাঁজ। তরবারি খাপখোলা হলে কেটেকুটে বিখণ্ডিত হয় আদনান। এটা মাস ছয়েক আগের চিত্র। আদনানের আর্শীতে কালো রুপের ছায়া পড়ার আগের কথা। মেয়েটির নাম পরমা। মেয়েটির বয়স ছাব্বিশ। গায়ের রঙ যেনো নদীর ঘোলা জল। মেয়েটির চোখ রূপকথা। আর আদনান সেই রূপকথার অন্ধ ঘোড়সওয়ার। কালো মেয়েটির ছায়া আদনানের আর্শীতে পড়েছে ঠিক সেই জায়গাটিতে যেখানে কল্পলোকের সমস্ত রহস্য ঠোঁটে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো বিপাশা। শেষের দুমাসে বিপাশার ভালোবাসার আলোটুকু গিলে খেয়েছে কল্পনার কালো রুপের ছায়া। পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ।

আদনান স্থির করে ফেলেছে, আর দেরি নয়। আজই বিপাশার জীবনের শেষদিন। পরিকল্পনাটা ছকে ফেলেছে দীর্ঘদিন ধরে। সুস্থির মাথায় একটু একটু করে। জিনিসপত্রগুলোও যোগার যত্নের ব্যাপার ছিল। একটা নীল রঙয়ের পাতলা ব্লাংকেট। নীল বিপাশার প্রিয় রং। মুখ বাঁধার জন্য গামছা। এক বান্ডেল নাইলনের দড়ি। ব্লাংকেটের উপর পেচানোর জন্য কিং সাইজের কালো বেড কভার। আর একটা আট ইঞ্চি ধারালো ছুরি, কিচেন নাইফ। আর এফ এলের বেস্টবাই দোকান থেকে কেনা। কেনার সময় বিপাশা সাথেই ছিল। সে মগ্ন হয়ে সংসারের এটা ওটা কিনছিল। হঠাৎ মুখ তুলে বিপাশা জিজ্ঞেস করেছিল,
-একসেট কিচেন নাইফতো ঘরে আছেই। এটা আবার আলাদা করে কিনছ কেন, অনি?
-তোমাকে খুন করবো। সাইজ দেখেছো? আমূল বিঁধে যাবে তোমার হৃদপিণ্ড পর্যন্ত।
বলার সময় আদনান তার চোখে ফুটিয়ে তুলেছিল অন্য এক নেশা। চোখের যে নেশায় বিপাশা খুন হয়ে যায় প্রতিদিন। নিজের সাইত্রিশ মাপের বুকের বামপাশে তাকিয়ে বিপাশা হেসেছিল। চোখে ছিল ভালোবাসার বালুচর।

ওদের বিয়ে হয়েছে তিন বছরেরও বেশি সময় আগে। তখন বিপাশার অনার্স ফাইনাল ইয়ার। অতিমাত্রায় সুন্দরী মেয়েগুলোর পড়াশুনায় আগ্রহ কম থাকে। উজ্জ্বল গাত্রবর্ণকে কিভাবে আরো উজ্জ্বল করা যায় গবেষণাটা সেখানেই লটকে যায়। ধনুকের মত ঈষৎ বাঁকা ভ্রূ, চুলের ডাই অথবা ফিনফিনে শিফনের কলাপাতা সবুজ রং এসব ভাবতে ভাবতেই দিনের আধখানি শেষ হয়ে যায়। এক ভাই এক বোনের সংসারে বিপাশা বড়। স্বভাবে কিছুটা অন্তর্গত।

আদনানের নিজের অফিস। জন্মসূত্রে পাওয়া ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদবি পাওয়ার জন্য আদনানকে শুধু অস্ট্রেলিয়া থেকে পড়াটা শেষ করে আসতে হয়েছিল। শান শওকতের অফিস। আদনান স্মার্ট, বিনয়ী। এ লেভেল শেষ করে চলে গিয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া। পাকাপাকি দেশে ফিরেছে পাঁচ বছর আগে। বিপাশার সাথে বিয়ের পর থেকে আদনান ছিলো সুখী গৃহী। ঘরে ফেরার টানটা সবসময়ই থাকে। প্রতি ঘণ্টায় বিপাশার ক্ষুদেবার্তা না পেলে অস্থির কাটে সময়। টেক্সটগুলো আগামাথা ছাড়া। যেমন, দশটার দিকে ফোন বিপ বিপ করবে। আদনান স্ক্রিনে ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লেখা দেখতে পাবে, “অনি, তোমাকেতো বলা হয়নি। আজ সকালে দাঁত ব্রাশ করার সময় আমার দাঁত থেকে রক্ত পড়ছিল। এখনো কেমন সিরসির করছে। আমার না ভীষণ ভয় করছে, জানো!” দুপুরে ভাতঘুম থেকে উঠে হয়তো লিখবে, “তোমার বৌয়ের মন খারাপ, অনি। কালো ব্রেসলেটটা খুঁজে পাচ্ছিনা। অইযে যেটা মালয়েশিয়া থেকে এনেছিলাম। আমার অন্নেক প্রিয়। কালো ক্রিস্টালের বল বল।” আদনান হয়তো ছোট্ট করে লিখে পাঠাবে, “চুমু”। আদনান সবসময় উত্তর দেয় না। ব্যস্ততায় সময় করতে পারেনা। কিন্তু এইসব প্রায় অবান্তর লিখাগুলো ঘণ্টায় ঘণ্টায় না পেলে বুকের ভেতর খচখচ করতে থাকে। অস্থিরতায় পেয়ে বসে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে বিপাশা। বিছানায় আধশোয়া হয়ে বিপাশার সাজসজ্জা শেষবারের মত দেখে আদনান। কোথাও বেড়াতে যাবার আগে দীর্ঘ সময় ধরে আয়নার সামনে কাটানোর অভ্যাস বিপাশার। আলমারি ভর্তি কাপড়ের স্তুপ থেকে পরার যোগ্য কোন কাপড় কখনোই খুঁজে পায় না বিপাশা। বাধ্য হয়ে আদনান কিছু একটা খুঁজে বের করে দিলে সোনামুখ করে সেটাই পরে সে। ড্রেসিং টেবিলের উপর এলোমেলো রাখা রাজ্যের জিনিসপত্র। ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কারের পর ময়েশ্চারাইজার। তার পরে বেস পাউডার। আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করবে,
-দেখতো পাউডারের কোটটা কি আমার স্কিনটোনের সাথে গিয়েছে নাকি আর একটু বাড়িয়ে দেবো।
বৌয়ের এসব আদিখ্যেতা আদনান ভালোই উপভোগ করে। কিন্তু আজ করছে না। মনে মনে উত্তর দেয়,
-শেষবারের মত সেজে নাও কন্যা।

লাল ফেরারি গাড়িটা কেনা হয়েছিল শুধু বিপাশার জন্য। বিয়ের আগে সাদা স্টারলেট চালাতো আদনান। বিপাশা এসেই লাল গাড়ির জন্য গোঁ ধরেছে।
-আমার একটা স্বপ্ন ছিলো জানো, অনি!
-কি স্বপ্ন?
-আমার বর হবে রাজপুত্রের মত সুন্দর। মাথাভর্তি থাকবে কদম ফুলের মত চুল। আমরা যখন তখন লং ড্রাইভে যাবো। আগের দিন হলে ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে যেতাম। একটা লাল ঘোড়া। রেশমের মত সিল্কি সিল্কি পশমে ঢাকা থাকবে তার মসৃণ শরীর। পথে পথে আমাদের দিকে সবাই ঈর্ষার চোখে তাকাবে।
-কন্যা, তোমার লাল ঘোড়ায় চড়ার স্বপ্নতো পূরণ করতে পারবোনা। কিন্তু লাল গাড়ি তোমার জন্য এনে দিতে পারবো।

ফেরারির স্পিডলিমিট ষাট ছুঁইছুঁই। আদনানের মাথার ভেতর চিন্তার স্পিড একশোর বেশি। গাড়িতে বসেই অভ্যাসমত ননস্টপ কথা বলে চলেছে বিপাশা। আদনান কিছু শোনে কিছু শোনে না। শুধু প্রয়োজনমত হ্যাঁ না কিংবা হু বলে। জার্নিতে একটু পর পর বিপাশা কোকের বোতলে চুমুক দিবে। সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে আদনান। তরল কোকের সাথে পাউডার করে মেশানো হয়েছে চারটা ভেলিয়াম ফাইভ। বিশ পঁচিশ মিনিটের মধ্যে শরীরে ছড়িয়ে পড়বে ঘুমের ওষুধ আর তন্দ্রালু হতে হতে একসময় ঘুমিয়ে পড়বে বিপাশা।

ততক্ষণে গাড়ি পৌঁছে যাবে কাঞ্চন ব্রিজের কাছাকাছি। ঢাকার নতুন শহর গড়ে উঠছে এদিকটায়। গাড়ি তিনশ ফিট রাস্তা থেকে একটু বাঁক নিয়ে পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় ঢুকে যাবে। এদিকটায় বসতবাড়ি উঠতে আরো বছর দশেক লাগবে। কিন্তু রাস্তাঘাটের লে আউট তৈরি হয়ে গিয়েছে। প্লটের সীমানা নির্ধারণের কাজও শেষ। এসব জায়গাগুলোকে রাতের বেলা মানুষজন বড় একটা থাকে না। চারিদিকে কাশবনের ঝোপ। এখানেই কোথাও গাড়িটা দাঁড় করিয়ে অচেতন বিপাশাকে খুন করার কাজটা সেরে ফেলবে। তারপর ব্লাংকেটে মুড়িয়ে কাঞ্চন ব্রিজের উপর থেকে নিচে ফেলে দিলেই ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্তি।

-অনি, গন্ধ শুঁকে বলতো আজ আমি কোন পারফিউম মেখেছি?
-হু, বলতে পারছি না।
অন্যমনস্কতা কাটাতে পারছে না আদনান। অথচ এখন তাকে স্থির থাকতে হবে। এমন কিছু করা যাবে না যাতে করে বিপাশার সন্দেহ হয়। অন্যদিনগুলোতে রাতের বেলা ড্রাইভে গেলে তারা যা যা করে তাই করা উচিৎ। কিন্তু কিছুতেই স্থির থাকতে পারছে না সে।

পরমার ইন্টারভিউ বোর্ডে আদনান ছিলো। একসাথে ডিরেক্ট কাজ করতে হবে এই পজিশনের প্রার্থীটিকে তাই আদনান ভালো করে লক্ষ্য করছিলো মেয়েটির চৌকষ উত্তর। বুদ্ধিমত্তা। কাজে জয়েনের সাথে সাথেই আদনান বুঝতে পেরেছিলো মেয়েটি একটি অনন্য প্রতিভা। ধীরে ধীরে চোখে পড়েছিলো পরমার মধ্যে রয়েছে একটা আলাদা সৌন্দর্য। যেই সৌন্দর্য রূপের চেয়ে বেশি কিছু। মেয়েটির শরীরে অঢেল বিত্ত বৈভব নেই। কিন্তু কালো রঙ্গটিতেই যেন ওর ব্যক্তিত্ব বেশি ফুটে উঠেছে। প্রথম দিকে আদনানের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি পরমার ছিলো ভীষণ রকম উদাসীনতা। আদনানের সেটা ঔদ্ধত্য মনে হত। মেয়েটি নিজের চারপাশে তৈরি করে রেখেছিলো নিষিদ্ধের একটা বলয়। সেই নিষিদ্ধের আকর্ষণ ক্রমশ কাছে টেনেছে আদনানকে। পরমা কাছে এসেছে কিন্তু কোথায় যেন দূরে রয়ে গিয়েছে। পরমা বলেছে,
-যদি ভালোবাসো আমায় তবে আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরিয়ে দেখাও। যদি ভালোবাসো আমায়, সোনার হরিণ এনে দাও। যদি ভালোবাসো আমায়, তবে একার করে আমার হও আদনান।

আদনানের লাল ফেরারি কাঞ্চন ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। ঘড়িতে রাত এগারোটা বেজে সাতচল্লিশ। এগারোটার দিকে কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাই ওভার পার হয়ে তিনশ ফিট রাস্তার পাশে ফুড আইলেন্ডে থেমে রাতের ডিনার করেছে। জাঙ্কফুড বিপাশার পছন্দের খাবার কিন্তু সে কিছুতেই মুটিয়ে যায় না। শরীরটা ছিলা টান টান ধনুকের মতই রয়ে যায়। গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে বিপাশার দিকে তাকায় আদনান। চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছে। ডায়াজিপাম কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে। কিছুটা আচ্ছন্নের মত আদনানের দিকে তাকায় বিপাশা। অসাধারণ রূপবতী একটা মেয়ে। মনে মনে আদনান ভাবে, নির্বোধ সুন্দরী।

তিনশ ফিট মূল রাস্তা ছেড়ে গাড়ি নেমেছে পূর্বাচল আবাসনের দিকে। এবড়ো খেবড়ো মাটির রাস্তা। কদাচিৎ এক একজন মানুষ দেখা যায়। গাড়ির সামনে এসে একটা কুকুর হেড লাইটের তীব্র আলোয় ভয় পেয়ে দৌঁড়ে পালায়। বিপাশা এখন পুরোপুরি অচেতন। বড়সড় কাশঝোপের পেছনে নিচু বাউন্ডারি দেওয়া একটা খালি প্লট। বাঁশের মাচায় ঝিঙে লতা। মাঝেমাঝে সবুজ ঝিঙে ঝুলছে মাচার ফাঁক দিয়ে। সব কিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এত আলো কেন, ভাবে আদনান। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশে পূর্ণমাসের চাঁদ। এই বিষয়টা আদনানের মাথায় ছিলোনা। দিনের হিসেব মেলাতে বিরাট এক ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। এতদুর এগুনোর পর আর পেছানোর উপায় নেই। গাড়িটা ঝিঙে মাচার পাশে দাঁড় করে স্টার্ট দেয়া অবস্থাতেই। নেমে ব্যাকডালা থেকে বের করে আনে জিনিসগুলো। শরতের হালকা শীতেও একটু একটু ঘামছে সে। হাতের উল্টাপিঠে ঘাম মুছে গাড়িতে গিয়ে বসে আদনান।

শেষবারের মত জীবিত বিপাশার দিকে তাকায় আদনান। সাদা পালাজ্জোর সাথে একটা লাল শার্ট পরেছে। আঁটসাঁট হয়ে শরীরের সাথে গেঁথে আছে শার্ট। গলার কাছ থেকে নিচের দিকে দুটা বোতাম খোলা। ক্লিভেজের ভাঁজে আটকে আছে লাল পাথরের ছোট্ট লকেট। বিপাশার জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলো এটা। ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। জীবের লালা দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। ছুড়িটার দিকে তাকায় আদনান। ঝিকমিক করে উঠে ছুড়ির ফলা। বিপাশার মুখটা বেঁধে ফেলতে হবে। ছুড়ি বিঁধলে চেতনা ফিরে আসবে আর তখন চিৎকার করে উঠতে পারে। নতুন গামছাটা হাতে নিয়ে বিপাশার মুখের কাছে এগোয় আদনান।

বিপাশার মাথাটা সিটের একদিকে কাত হয়ে আছে। চাঁদের নরম আলো এসে পড়েছে ওর মুখের উপর। চাঁদের আলো ব্যাপারটার মধ্যে কোন একটা ঝামেলা আছে। আজ চন্দ্রমা না হলে ভালো ছিলো। আজ চন্দ্রমা না হলে ভালো ছিলো। তাকাবে না করেও বিপাশার মুখের দিকে তাকায় আদনান। কি মায়াময় একটা মুখ! ভরসায়, মমতায় আর ভালোবাসায় মাখামাখি। ধীর লয়ে নিঃশ্বাস পড়ছে। গাড়ির শীতাতপ যন্ত্র চলছে। তারপরেও বিপাশার নাকের উপর রিনরিনে ঘামের ফোটা। ঘুমন্ত মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দটা একটু ভিন্ন হয়। খানিক থমকে থাকে আদনান। নতুন গামছাটা থেকে কেমন এক ধরনের ঘ্রাণ আসছে। কাত হয়ে থাকা মাথাটা সোজা করে গামছা দিয়ে যত্ন করে বিপাশার নাকের ঘাম মুছে দেয়। গাড়ির স্টিয়ারিঙয়ে হাত রেখে আদনান মনে মনে ভাবে, কাল শুক্রবার হলে ভালো হত। সকালে বেশিক্ষণ ঘুমোনো যেত।






মন্তব্য চালু নেই